ঢাকায় জাকিরের ৩ বাড়ি, ২৮ ফ্ল্যাট

তিনি জাকির হোসেন। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। একসময় ছিলেন হোটেল বয়। এখন কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। রাজধানীর পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর ও সিদ্ধেশ্বরীতে তিনটি বাড়ি ও ২৮টি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। জাকিরের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। এ সময় তিনি ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের হাত ধরে যুবলীগে প্রবেশ করেন। ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভবন দখল—এ ধরনের সব অপকর্মে সম্রাটের অন্যতম সহযোগী জাকির। সম্রাট-ঘনিষ্ঠ যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, সম্রাটের অবৈধ আয় করা অর্থের বেশির ভাগ গচ্ছিত রয়েছে জাকিরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। ওই টাকার পরিমাণ অন্তত সাড়ে তিন শ কোটি টাকা। ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযানের পরের দিনই জাকির সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। সম্রাট-ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরো জানায়, সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগের রাতেও সম্রাটের সঙ্গে জাকিরকে দেখা গেছে। বড় ধরনের বিপদ হলে টাকার প্রবাহ যাতে বন্ধ না হয় সে জন্য সম্রাটসহ ঘনিষ্ঠরা পরামর্শ করে জাকিরকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেয়। সিঙ্গাপুরে জাকিরের নামে একটি কম্পানিও রয়েছে।

১৯৭৪ সালে বাস্তুহারা জাকিরের পরিবার বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় তাদের ঠিকানা হয় ডেমরার চনপাড়া বস্তি। ওই বস্তিতে বেড়ে ওঠেন জাকির। ১৯৯১ সালের দিকে জাকির কাকরাইল এলাকায় পায়েল নামে একটি রেস্টুরেন্টে দৈনিক ৩০ টাকা বেতনে গ্লাস বয়ের কাজ নেন। এক বছর পর গ্লাস বয়ের কাজ ছেড়ে মাসে দুই হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন কাকরাইলের ফরিদপুর ম্যানসনের তৃতীয় তলায় ‘টনি ফিল্ম’ প্রতিষ্ঠানের পিয়ন হিসেবে। ওই সময় আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতাকর্মীদের নিয়মিত আড্ডা ছিল কাকরাইলের ফরিদপুর ম্যানসনের নিচে ‘হোটেল ম্যারাডোনা’কে কেন্দ্র করে। সেখানেই ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় হয় জাকিরের। এরপর তাঁরা ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্রাটসহ তাঁর সহযোগীরা কাকরাইল, মতিঝিল, ফকিরাপুল, আরামবাগ, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, সড়ক ভবনসহ আশপাশের এলাকার সরকারি দপ্তরগুলোর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। পাশাপাশি ওই সব এলাকার সালিস-দরবার, জায়গা-জমি দখল করে অর্থ আদায়, সরকারি-বেসরকারি ভবন নির্মাণে ঝামেলা সৃষ্টি করে চাঁদাবাজি শুরু করেন। সম্রাটের দলীয় প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠদের অপতৎপরতাও বাড়তে থেকে। প্রথমে তারা মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের জুয়ার আসরের দখল নেয়। তখনো অবশ্য ক্যাসিনো সংযোজন হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের জুয়ার আসর দখলের পর আরামবাগ-ফকিরাপুল এলাকার ক্লাবগুলো একে একে দখল নিতে থাকে তারা। পরে তারা অধিক লাভের জন্য দখল করা ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনোর সংযোজন ঘটায়।

অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতে আসতে শুরু করলে ওই অর্থ বৈধ করতে জাকির খুলে বসেন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ‘জাকির ট্রেডিং’ নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি খুলে চীন থেকে টেলিভিশনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি শুরু করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের নামেই ব্যাংকে জমা হতো জাকির ও সম্রাটের ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন খাত থেকে আসা অবৈধ অর্থ। বছরখানেক আগে সম্রাট থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন জাকির। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, সে সময় জাকিরের ব্যাংকে গচ্ছিত ছিলো ৪০০ কোটি টাকা। জাকিরের দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি টের পান সম্রাট। এ সময় সম্রাট জাকিরের ওপর হুলিয়া জারি করে ঘোষণা করেন, জাকিরকে পাওয়া মাত্র গুলি করা হবে। এই হুমকিতে জীবনের ভয়ে জাকির কিছুদিন সিঙ্গাপুরে পালিয়ে থাকেন। পরে দেশে ফিরলে সম্রাট ও জাকিরের পুরনো বন্ধুরা বিষয়টির সমঝোতা করে দেন। সমঝোতার শর্ত হিসেবে জাকির মেনে নেন, ব্যাংকে গচ্ছিত ৪০০ কোটি টাকার অর্ধেকের মালিক সম্রাট।

২০১২ সালে ১৯ পুরানা পল্টন লাইনে আবদুল খালেক নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২৭ কোটি টাকায় ৯ কাঠা জমি ক্রয় করেন জাকির। ওই জায়গার ওপর এখন জাকিরের ছয়তলা ভবন। তবে ওই ভবনে জাকির বসবাস করেন না। বসবাস করেন তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। এর তিন মাস পর বিজয়নগর পানির পাম্প গলিতে কিনে নেন একটি চারতলা বাড়ি। একই সময়ে বিজয়নগর ৫৬/বি নম্বরে আরেকটি ছয়তলা বাড়ি ক্রয় করেন।

২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় ১৩টি, সেগুনবাগিচা এলাকায় আটটি, বিজয়নগর এলাকায় ছয়টি এবং সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন জাকির। এ ছাড়া শান্তিনগরের টুইন টাওয়ারে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম তলায় সাতটি দোকান কিনেছেন জাকির। গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় রয়েছে তাঁর ১০০ কাঠা জমি। বিজয়নগর এলাকার জাকিরের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী ও বন্ধুরা জানান, গড়ে প্রতিটি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে এক কোটি টাকায়। টুইন টাওয়ারের দোকানগুলো কেনা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা করে। কোনাবাড়ীর জমি কেনা হয়েছে পাঁচ কোটি টাকায়। ১৯ পুরানা পল্টন লাইনের বাড়ি ছাড়া অন্য দুটি বাড়ি কেনা হয়েছে ২১ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে জাকিরের দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি টাকা। কাকরাইলের ভুইয়া ম্যানসনের যে ভবনে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট তাঁর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন ওই ভবনের চতুর্থ তলাও জাকিরের ক্রয় করা। সেটিকেই প্রথম সম্রাট তাঁর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন। পরে ওই ভবনের অন্য তলাগুলোও দখলে নেওয়া হয়।

জাকির হোসেনের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ১৯ পুরানা পল্টনের বাড়িতে বসবাসকারী জাকিরের একজন আত্মীয় বলেন, ‘তিনি ঢাকায় নেই, বিদেশে আছেন।’ জাকিরের ঘনিষ্ঠরা জানান, তিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।

আরও পড়ুন