তামিমকে বাদ দেয়ার সময় এসেছে

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চলমান তিন ম্যাচ সিরিজের দুইটিতেই হেরেছে বাংলাদেশে। আর এ ম্যাচগুলো নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ দলের এক সময়ের নির্ভরযোগ্য তারকা তামিম ইকবাল। নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজার ইনজুরি ও সহঅধিনায়ক সাকিব আল হাসান ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন এই ওপেনার। কিন্তু তিনি কোন ভালো পারফরমেন্স দেখাতে পারেননি।

এ দু’টো ম্যাচেই যে বিষয়টি দেখা গেছে, তাহলো দলের ক্যাপ্টেন তামিম ইকবালের একেবারেই অল্প রানে আউট হওয়া। তবে তার চেয়েও বেশী চোখে লেগেছে দুটো ম্যাচেই তামিম ইকবালের বোল্ড আউট। প্রথম ম্যাচে লাসিথ মালিঙ্গা আর দ্বিতীয় ম্যাচে ইসুরু উদানার বলে আউট হওয়ার আগে তামিম পিচেও লুটিয়েছেন ইয়র্কার লেংথের বল সামলাতে গিয়ে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ০ ও দ্বিতীয় ম্যাচে ১৯ রানে আউট হন তামিম।

এ নিয়ে তামিম ইকবাল টানা ছয় ম্যাচে বোল্ড হলেন, যা বিশ্ব ক্রিকেটে একটি রেকর্ড। ওয়ানডে ক্রিকেটে কোনো ওপেনারই টানা ছয় ম্যাচে বোল্ড হওয়া দূরের কথা, কেউ এমনকি টানা পাচঁ ম্যাচেও বোল্ড হননি।

বিশ্বকাপেও ভালো করতে পারেনি তামিম। এবারের বিশ্বকাপে সাত ইনিংসে ৩২.৪২ গড়ে ২২৭ রান করেছেন তিনি। স্ট্রাইক রেট ৭৩.৯৪। কিন্তু এই পারফরম্যান্স তামিমের নামের সঙ্গে ঠিক মানানসই নয়। গেল চার বছরের পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই বোঝা যায়। ২০১৫ সালে তামিমের ব্যাটিং গড় ছিল ৪৬.৩৮, ২০১৬ সালে ৪৫.২২, ২০১৭ সালে ৬৪.৬০ ও ২০১৮ সালে ৮৫.৫০।

চলমান আসরে প্রতিটি ম্যাচেই দুই অঙ্কে পৌঁছেছেন তামিম। জাগিয়েছেন বড় ইনিংস খেলার সম্ভাবনা। তবে আশার বেলুন চুপসে যেতেও সময় লাগেনি। কেবল একটি ম্যাচেই পেয়েছেন হাফসেঞ্চুরি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন ৬২ রান। তার বাকি ইনিংসগুলো হলো যথাক্রমে ১৬, ২৪, ১৯, ৪৮, ৩৬ ও ২২।

উইকেটে মানিয়ে নেওয়ার পর বারবার অল্প রানে আউট হওয়ায় তামিমের ব্যাটিং কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া তিনটি বিশ্বকাপে (২০০৭, ২০১১ ও ২০১৫) খেলার অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের মাটিতে কাজে লাগাতে না পারায় বিভিন্ন মহলে চলছে সমালোচনা। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা এ নিয়ে খুবই সরব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। তবে রোডস আশাবাদী। তার বিশ্বাস, এবার না পারলেও আগামী বিশ্বকাপে তামিম ঠিকই ভালো করবেন।

এমতাবস্থায় স্বাভাবিকই প্রশ্ন উঠছে তবে কি, তামিম দলের বোঝা?

বাংলাদেশী ওপেনারের সাম্প্রতিক ফর্ম দলে তার অন্তর্ভূক্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্বকাপেও তামিমের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, তবে দলের নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার অনুপস্থিতিতে তাকেই শ্রীলঙ্কা সফরে দলের ক্যাপ্টেন বানিয়ে দেয়া হয়।

তামিম ইকবালের শৈশবের ক্রিকেট শিক্ষক নাজমুল আবেদীন ফাহিম। তিনি অবশ্য মনে করেন, তামিম দলের বোঝা নন।

ফাহিমের মতে, সমস্যা আছে অবশ্যই তামিমের, ওর আত্মবিশ্বাসে সবচেয়ে বড় সমস্যা। সে ফুটওয়ার্ক, টাইমিং এসব নিয়ে দ্বিধায় ভোগে। তবে দলের জন্য বোঝা, এটা ভাবা ভুল।

কিছু কিছু খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সমালোচনা হলে তাদের ফিরে আসাটা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন বর্তমানে বিসিবির জন্য কাজ করা এই কোচ।

নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেন, তামিমকে ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আরো কিছুদিন চলতে পারবে না, কারণ তার একজন যোগ্য পরিবর্তন প্রয়োজন। তামিমের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে, অনেক বছর ধরে ভালো ক্রিকেট খেলেছেন। তাই আমার কাছে মনে হয় ঠিকমতো সমস্যা নিয়ে কাজ করলে, তার জন্য ফিরে আসা সহজ হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বলেন, আমার মনে হয় খুবই খারাপ সময় যাচ্ছে ওর। ওকে বাদ দেয়ার চিন্তা না করে বরং কত তাড়াতাড়ি ফর্মে ফিরতে পারে তা ভাবা উচিত। ওর জায়গায় কে ভালো খেলছে এটা দেখতে হবে। এমন যদি হতো অন্য রিপ্লেসমেন্ট আছে, সেক্ষেত্রে বাদ দেয়া যেতে পারে। এখন বয়সের প্রাইম টাইমে আছেন তিনি। বিকল্প তৈরি না করে বাদ দিলে আত্মঘাতী হতে পারে।

তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ফ্যানদের অনেকেই তামিমের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সে খুবই হতাশ।

তামিম ইকবালের খারাপ সময়

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬২ রানের ইনিংস ছাড়া আর কোনো পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস নেই তামিমের। কেবল অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই তামিম ইকবালের স্ট্রাইক রেট ৮০ অতিক্রম করে।

স্ট্রাইক রেট ও ব্যাট হাতে ফর্মে না থাকা ছাড়াও কখনো কখনো তামিম নন-স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যানকে রান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েও ফিরে গিয়েছেন ক্রিজে, ফলে বলি দিতে হয়েছে নন-স্ট্রাইকারের উইকেট – এমন অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

তামিম ইকবাল শেষবার শতক হাঁকিয়েছেন ২০১৮ সালের ২৮শে জুলাই – এক বছর আগে। ওই সিরিজে তামিম ইকবালের দুটো শতক ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।

এরপর তামিমের সর্বোচ্চ অপরাজিত ৮১ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই – সিলেটে।

২০১৯ সালে তামিম এসেছেন সবচেয়ে পরিণত অবস্থায়। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গত চার বছরে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল উজ্জ্বল। কিন্তু ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে এসেই যেন পাল্টে গেছে সবকিছু। রান পাচ্ছেন না, তার চেয়েও বড় কথা, উইকেটে থেকে দলকে ভরসাও দিতে পারছেন না। বিশ্বকাপের পরেও জ্বলে উঠলেন না তামিম। এখন স্বাভাবিকই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ফুরিয়ে যাচ্ছেন তামিম?

আরও পড়ুন