নারী-শিশু নির্যাতন আইয়ামে জাহিলিয়াতকেও হার মানাচ্ছে

সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু ও নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় বর্তমানে নারী ও শিশু ধর্ষণ বেড়ে গেছে।২০১৮ সালে দেশে ৪৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণের কারণে প্রাণ হারায় ২২ শিশু। যায়। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে ২৭১ শিশু।

অন্যদিকে আইন ও সালিস কেন্দ্র এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ২৫৩ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ধর্ষণ-চেষ্টার শিকার হয়েছেন ২০০ জন ও যৌন হয়রানির শিকার ২২১ নারী। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫১ জন, ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৬২টি এবং আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন।

এ সময়ে ধর্ষণের প্রতিবাদে খুন হয়েছেন তিনজন নারী ও দুজন পুরুষ। এই তথ্যানুযাইয়ী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬৭ জন শিশু আর ধর্ষণ চেষ্টার শিকার ১৩৫ জন শিশু। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৮০ জন মেয়েশিশু এবং ২৬ জন ছেলেশিশু। ঘটনাগুলো কার না বিবেককে দংশন করে? মানুষরূপী হায়েনাদের কবলে পড়ে নারী শিশুরা অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

জীবনের প্রারম্ভে কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই অবুঝ শিশুরা নরপশুদের লালসার শিকার হয়।হয় ভয়ানক নৃশংসতার শিকার।সামাজিক অবক্ষয়ের এমন করুণ শিকারে পরিণত হওয়ার পর শিশুরা শারীরিকভাবে নানা জটিল সমস্যায় পড়ে। মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়।এই সেরা জীবদের পক্ষ থেকে শিশুদের সঙ্গে করা এমন গর্হিত আচরণ সর্বস্তরের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সমাজের সর্বত্র অপরাধ প্রবণতা কতটা সীমা ছাড়িয়ে গেছে, চারদিকে চলমান হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ও আত্মহননের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা তার বড় প্রমাণ। নীরবে-নিঃশব্দে চলা এসব অপরাধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শঙ্কা তৈরি করছে। মানবিক মূল্যবোধ লোপ পাওয়ায় এবং শিশুর প্রতি সহজাত স্নেহ ও মমত্ববোধ কমে যাওয়ার কুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে শিশুদের প্রতি ধর্ষণ ও সহিংসতাকে।

যে সমাজ ও দেশে নারী ও শিশুরা যত নিরাপদ, সে সমাজ ও দেশ ততই উন্নত। অথচ আজকের সমাজে আমাদের নারী-শিশুরা হররোজ কত রকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তা ভাবতে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। নারী-শিশুর প্রতি সমাজের চলমান নিষ্ঠুরতা অবসানে শুধু নারী সংগঠনগুলো কেন, পুরুষদের সমানতালে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। সর্বস্তরের সবার প্রতিবাদের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আর এরকম ঘটনার বিচারগুলো দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হলে পুনরাবৃত্তি কমে যাবে।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উপলক্ষে ২২টি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের মিলিত উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২৭ নভেম্বর ব্যতিক্রমী এক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে বক্তারা নারী ও শিশুর ওপর ধর্ষণসহ সব ধরনের অত্যাচার বন্ধের আহ্বান জানান। সেখানে আয়োজক সংস্থার প্রতিনিধিরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নানা শ্রেণি ও সংগঠনের কর্মী, সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, যৌন কর্মী, অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার, ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর পরিবারের সদস্যরা।

নানা শ্রেণি-পেশা ও বয়সের ব্যক্তিরা এসময় প্রতিবাদী ব্যানার ও প্লাকার্ড প্রদর্শনের পাশাপাশি নির্যাতনবিরোধী স্লোগান দেন। প্রতিবাদ সমাবেশের পাশাপাশি ছিল প্রতিবাদী গান, আবৃত্তি, বিবৃতি ও ফ্লাশ মবের আয়োজন। আয়োজনে ছিল আমরাই পারি জোট, ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, অ্যাকশন এইড, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষ, ব্রতী, কোস্টট্রাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, এশিয়াটিক, ব্র্যাক, আইপিডিএস, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্লাস্ট, নবোলোক, কর্মজীবী নারী, সহায়, উবিনীগ, নারী মৈত্রী, সিপিডি, বিলস, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ আরো কয়েকটি সংগঠন।

বিশ্লেষণে জানা গেছে, পরিবার থেকেই নারী-শিশুদের প্রতি ধর্ষণসহ নিপীড়ন শুরু হয়। তাই পরিবারের শিশুদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। ঘর-পরিবার থেকে সতর্ক ও সচেতনতা সৃষ্টি হলে সমাজেও এ প্রতিফলন পড়বে। এ ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি করতে হবে সামাজিক সচেতনতা।এভাবে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধমীয় জায়গাগুলোয় এর কুপ্রভাব সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগকে হার মানানো চলমান নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা।

আরও পড়ুন