পার্থকে নিয়ে ধামরাইয়ে যত আলোচনা

দুপুর ১২টা। ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকার একটি চায়ের দোকানে জমেছে আড্ডা। চলছে দেশে চলমান নানা ইস্যু নিয়ে কথোপকথন। সেই কথোপকথনে উঠে আসে তাদেরই এলাকার সন্তান সদ্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসে যাওয়া সিলেটের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিকের নাম। নিজ বাসা থেকে আশি লাখ টাকাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা করে সংস্থাটি। চায়ের ওই আড্ডার আলোচনায় উঠে আসে পার্থর পারিবার, ক্যারিয়ারসহ নানা গল্প। এসব আলোচনার কারণ একটাই, রথখোলা এলাকার এই সন্তানের দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার খবর। গত রোববার বিকালে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ধানমন্ডির বাসা থেকে পার্থকে ঘুষের ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তারের পরপরই সর্বত্র খবর ছড়িয়ে পড়ে।

আর এ খবরে তোলপাড় সর্বত্র। বিশেষ করে পার্থর নিজ বাড়ি ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকায় মানুষের মুখে মুখে পার্থর বিষয়টি। কেউ অবাক হয়েছেন, কেউ মেনে নিতে পারছেন না। আবার কারো কাছে বিষয়টি স্বাভাবিকও মনে হচ্ছে। রথখোলার বাসিন্দা ইকবাল হাসান বলেন, পার্থ আমাদেরই এলাকার ছেলে। এমন কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বেন সেটা ভাবতেই পারিনি। তাদের পরিবার তো অনেক বড়। পারিবারিক ঐতিহ্য আছে। তার বাবাও অনেক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। বণিক বাড়ির কথা সবাই জানেন। কিন্তু পার্থর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুনে সবাই অবাক। পত্রিকায় খবর দেখে এলাকার সবার মধ্যেই এটা নিয়ে নানা কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

একই এলাকার বাসিন্দা সুমন বলেন, পার্থদের বাড়ির কেউ এখানে থাকে না। শুধু তার চাচাতো ভাইরা থাকেন। পার্থ বছরে একবারই আসেন। তবে তার পরিবারকে এলাকার মানুষ খুব ভালোই জানে। ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে কিভাবে জড়ালেন বুঝতেই পারছি না। অন্যদিকে রথখোলা এলাকার বাসিন্দা সাইফ উদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, সরকারি চাকরি যারা করে তাদের ঘুষ খাওয়া কোনো বিষয় না। এলাকায় ভালো থাকলেও কাজের জায়গায় তারা তো সবাই এক। ঘুষ নিতেই পারে। তবে এলাকার অনেকেই বিষয়টা জানার পর অবাক হয়েছে। তাদের পরিবারের যে সুনাম আছে সেটা নষ্ট করলেন কিভাবে পার্থ?

গতকাল সরজমিনে ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকায় পার্থের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে তাদের পরিবারের কেউ থাকেন না। তার এক চাচাতো ভাই বাড়ির নিচেই একটি ব্যবসা করছেন। তার নাম অমিয় গোপাল বণিক। মূলত তিনিই বণিক বাড়ি দেখাশোনা করেন। পার্থের বিষয়ে জানতে চাইলে অমিয় বলেন, আমরা এখনো কিছু বুঝতে পারছি না। গত দুইদিন ধরে বাজারে উঠতে পারি না। লজ্জা লাগে। সবাই এক কথা জিজ্ঞাস করছে। কিন্তু আমি পার্থকে ভালোভাবে চিনি। চাচাতো ভাই হলেও আমাদের তো একই বাড়ি। পার্থ যে ধরনের মানুষ সে তো এসব কাজ কখনো করতে পারে না। এখানে অন্য কোনো ঘটনা জড়িত কিনা তাও বুঝতে পারছি না। অমিয় গোপাল বণিক বলেন, পার্থর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ঝামেলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে কথা হয় না। সে বাড়িতেও ঠিকমত আসে না। শুধু পূজার সময় এসে ঘুরে যায়।

পার্থর বাবা ঠাকুর গোপাল বণিক ছিলেন ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকার মন্দির ও রথ পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। পার্থ বণিকের তিন ভাই ও দুই বোন। এর মধ্যে দুই বোনই মারা গেছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই শুভ গোপাল বণিক কানাডায় থাকেন। আর মেঝ ভাই তীর্থ গোপাল বণিক ঢাকার উত্তরার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ধামরাইয়ের রথখোলায় পার্থদের ২৪ শতাংশ জমির উপর যে বাড়িটি রয়েছে সেটি তার দাদার হাতেরই গড়া। স্থানীয়দের মধ্যে রথখোলা মন্দির ও রথ পরিচালনা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নন্দ গোপাল সেন জানান, পার্থকে ছোটবেলা থেকেই দেখছি। ওর বাবা আমার খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। একসঙ্গে উঠাবসা হতো। পার্থ এখানে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছে। চাকরি পেয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজও করেছে। তার ভাইরাও এখানে কেউ নেই। আশি লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি কিভাবে কি হলো কিছুই বুঝিনি। তিনি জানান, পার্থদের পূর্ব পুরুষের পুরনো ব্যবসা ছিল তামা-কাঁসার। সে ব্যবসা এখন নেই।

ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক বা তার পরিবার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা জানতে চাইলে নন্দ গোপাল সেন বলেন, সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে তার পরিবারের সম্পৃক্ততা নেই। এতটুকু আমি জানি। অবশ্য রথখোলা এলাকায় এ নিয়ে বেশ গুঞ্জন রয়েছে। পার্থর বাবা ঠাকুর গোপাল বণিক কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। পার্থ ২০০২ সালে চাকরিতে যোগ দেন। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিবারের সখ্যতা ছিল।

এদিকে দুদক সূত্র জানিয়েছে, ডিআইজি পার্থর কলাবাগানে যে বাড়িটি রয়েছে, সেটি তার শাশুড়ি মঞ্জু সাহার নামে কেনা। পার্থ বলেছেন, বাড়িটি তার শ্যালিকা কিনে দিয়েছেন। তবে ফ্ল্যাট বাড়িটির মালিক দুদককে নিশ্চিত করেছেন, বাড়িটি কিনেছেন কারা উপমহাপরিদর্শক নিজেই। সূত্রে জানা যায়, ডিআইজি প্রিজন পার্থর পরিবার যে গাড়িটি ব্যবহার করেন, সেটি তার এক বন্ধুর নামে। আর নিকেতনে একটি ফ্ল্যাট আছে পার্থর মা সন্ধ্যা বণিকের নামে। দুদকের অভিযানের শুরুতে জব্দ করা টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকাও তার শাশুড়ির বলে দাবি করেছিলেন তিনি। ব্যাংক থেকে উঠিয়ে সেগুলো বাসায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি। গত রোববার রাজধানীর কলাবাগান থানা এলাকায় পার্থ গোপাল বণিকের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে দুদক। সোমবার তাকে আদালতে নেয়া হলে আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠান। মামলার এজাহারে পার্থ গোপাল বণিকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে বৈধ পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত হিসেবে ঘুষ গ্রহণ করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৮০ লাখ টাকা অর্জন, অর্থের অবস্থান গোপন ও পাচারের উদ্দেশ্যে নিজের বাসায় লুকিয়ে রাখার অভিযোগ আনা হয়।

আরও পড়ুন