ফিরোজ-খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এলো, শামীমের গডফাদার কে?

গ্রেফতারের আগে ছয় মন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন টেন্ডার কিং জি কে শামীম। ঘনিষ্ঠ কজন শীর্ষ নেতার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কারও কাছ থেকেই তেমন কোনো সাড়া পাননি শামীম। শেষমেশ তার হাতের শেষ অস্ত্রটি কাজে লাগান। র‌্যাব কর্মকর্তাকে ঘুষের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। বলেন, ১০ কোটি টাকা দিবো, বিনিময়ে আমাকে গ্রেফতার করা যাবে না। অফিস-বাসা কোথাও তল্লাশিও চলবে না। টেন্ডার কিং এর এমন ঘুষের প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হন র‌্যাব কর্মকর্তা। তার চেহারায় বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শামীম বুঝতে পারে, এবার আর কোনো কিছুতেই শেষ রক্ষা হবে না। ধরা তাকে পড়তেই হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য দিয়ে বলেছে, রিমান্ডে থাকা শামীমের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব তথ্যে পুলিশ কর্মকর্তারাও বিব্রত হচ্ছেন। কজন মন্ত্রী ও নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় নাম ভাঙিয়ে প্রভাব খাটাতেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে। মন্ত্রীদের বাসায় তার যাতায়াত ছিল নিয়মিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের সঙ্গেও ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার ক্ষমতার দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে গাড়িতে হুইসেল বাজিয়ে সরকারি দফতরগুলোতে যখন তিনি ঢুকতেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের অনেককেই দেখা যেত তার লট বহরে। রুমে প্রবেশ করতেই কর্মকর্তাদের অনেকেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। পিডব্লিউডিতে তার প্রবেশ ঘটে স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার মাধ্যমে। এমনই এক পরিস্থিতিতে সময়ের সব চেয়ে আলোচিত ব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন এই টেন্ডার কিং জি কে শামীম। প্রশ্ন উঠেছে, টেন্ডার কিং-এর গডফাদার কে?

গত শুক্রবার ভোর থেকেই যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের নিকেতনের অফিস ঘিরে রাখে র‌্যাব। এক পর্যায়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম নিকেতনে এলে শুরু হয় অভিযান, আর কার্যালয়ে তল্লাশির প্রস্তুতি। র‌্যাব কর্মকর্তাদের অভিযান ও তল্লাশি করতে বারণ করেন জি কে শামীম। এর বদলে এক কর্মকর্তাকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ প্রস্তাব করেন তিনি। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। জব্দ করা হয় নগদ টাকা, এফডিআরসহ মাদক। তিনি এখন ডিবি হেফাজতে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে শামীম গণপূর্ত অধিদফতরের ২০ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার নাম বলেছেন, যাদের মাসে ২-৫ লাখ টাকা দিতেন তিনি। এর বদলে তারা শামীমকে ঠিকাদারির কাজের টেন্ডার পেতে সাহায্য করতেন। সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানান যে, ঢাকার বাসাবো ও নিকেতনে তার অন্তত পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট আছে। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তার বাড়ি রয়েছে। তার বাসাবো ও নিকেতনের বাড়ি দুটি খুবই অত্যাধুনিক। সেখানে গণপূর্তের যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মক’র্তারা তার সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক আলাপ ও লেনদেন করতেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল।

সূত্র আরও জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই টেন্ডার কিং সরকারি বড় বড় প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানান, ঠিকাদারির কাজ পাইয়ে দিতে তিনি দুই কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে জি কে শামীম আরও জানান, প্রতি টেন্ডারে ৮-১০ শতাংশ কমিশন দেওয়া লাগত তার। অনেক সময় নির্দিষ্ট কমিশনের পরও ঘুষ দিতে হতো। পূর্ববর্তী ও ভবিষ্যতের কাজ পেতে এখন পর্যন্ত গনপূর্ত অধিদফতরের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে তিনি ঘুষ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা ও গণপূর্তের ঢাকা জোনের আরেক সদ্য সাবেক কর্মকর্তাকেও ঘুষ দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা- এমন দাবি করেন তিনি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ জেরার মুখে অনেকের নাম ফাঁস করেছে। যুবলীগ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু পুলিশ কর্মকর্তাদের নামও বলতে শুরু করেছে। পুলিশকে কী পরিমাণ টাকা দেওয়া হতো, তার হিসাবও দিয়েছেন ক্যাসিনো কিং খালেদ। সূত্র জানিয়েছে, খালেদ বলেছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটই ক্যাসিনোর আসল রূপকার। তাঁর হাত ধরেই ঢাকার মতিঝিল থানার বিভিন্ন এলাকার স্পোর্টস ক্লাবগুলোয় ‘হাউজি’ আসরকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করা হয়। এ কাজে সম্রাটের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান খালেদ।

তার দেওয়া তথ্য মতে, এসব ক্লাবের ক্যাসিনোতে খেলা এবং সেগুলো পরিচালনায় যুক্ত হন আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাও। খালেদের এই স্বীকারোক্তিতে বিব্রতবোধ করছেন জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র বলেছে, এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে খালেদের তথ্যে ফেঁসে যেতে পারেন পুলিশ সদর দফতর ও মহানগর সদর দফতরের সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে অনেক শীর্ষ কর্তা; মহানগরের মতিঝিল, রমনা, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা বিভাগের অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও। জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকেই ক্যাসিনো কারবারের ‘গডফাদার’ দাবি করেছেন খালেদ।

এর বাইরে যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাসহ ঢাকা সিটি করপোরেশনের অনেকের নাম বলেছেন খালেদ। অপরদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং খ্যাত শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কালা ফিরোজ দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেপথ্য কারিগর। তার মূল ব্যবসা ছিল বিদেশে লোক পাঠানো। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশেই রয়েছে তার অফিস। রাজধানীর সেভেন স্টার গ্রুপের নেপথ্য গডফাদার এই কালা ফিরোজ। সুইডেন আসলামের শেল্টারদাতা কালা ফিরোজের নির্দেশে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে খুন-খারাপিসহ বড় ধরনের ঘটনাও ঘটে। তবে তিনি থেকে যেতেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০০৬ সালের ঘটনা। ওই সময়ে রাজধানীর পরীবাগে আলোচিত ‘দি তুর্কি অ্যাসোসিয়েটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাঁদা না পেয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল রমজান আলী মাস্টার নামে এক ব্যক্তিকে। সূত্র জানায়, আর এই হামলায় জড়িত অভিযোগে সরাসরি নাম উল্লেখ্য করে যে কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল তাদের অন্যতম ছিল শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজ। যিনি রাজধানীর কলাবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

গত শুক্রবার বিকালে কলাবাগান স্পোর্টিং ক্লাবে অবৈধ জুয়া বা ক্যাসিনো পরিচালনার দায়ে র‌্যাব কালা ফিরোজকে গ্রেফতার করে। অবশ্য কৃষক লীগ থেকে ফিরোজকে বহিষ্কারও করা হয়। জানা গেছে, এই শফিকুল আলম ফিরোজ এক যুগ আগেও সন্ত্রাসী কালা ফিরোজ নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পরিচিত ছিল। সময়ের পালাবদলে অপরাধ জগতের এই মানুষ খোলস পাল্টে হয়ে যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এ ছাড়াও তিনি জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সিনিয়র সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্বও দেয়। এখানেই শেষ নয়, এমন একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-৫ (শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ) আসনের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা-তদবির চালায়।

আরও পড়ুন