বন্ধুত্ব সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বের একটি ব্যাপার

বন্ধুত্ব এমন একটি বিষয়, যা সব সম্পর্কের উর্ধ্বের একটি ব্যাপার। জীবনের বিশেষ কোনো দিনে বন্ধুর শারীরিক উপস্থিতি না হোক কিন্তু মানসিকভাবে হলেও তার পাশে থাকা দরকার- এটাই কিন্তু বন্ধুত্ব।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন চিরসবুজ গায়ক কুমার বিশ্বজিৎ।

আমার শৈশবকালের বন্ধু সার্কেল অনেক বড়। হয়তো তারা আমার এই পেশায় নেই। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু পরিচিত মুখ। আমার সংগীত ক্যারিয়ার ৩৭ বছরের। এখানে সত্যিকার অর্থে কে আমার বন্ধু সেটা জেনেছি। বন্ধুত্ব ধরে রাখা অনেক কঠিন।

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার অনেক ঘটনা রয়েছে। যখন প্রথম ব্যান্ড দল গড়ি সেই সময়টাতে আমার আর বাচ্চুর দুই পরিবারের কেউই চাইতো না যে আমরা গান করি। আমি আমার বাবার একমাত্র ছেলে। অন্যদিকে, বাচ্চু ছিল পরিবারের বড় ছেলে, তাই তার মা চাইতো পরিবারের হাল ধরুক সে, সংগীতের দিকে যেন না যায়। ওই সময়ে সংগীতে যাওয়া মানেই উচ্ছন্নে যাওয়া।

আমার একটি ডিসকো গিটার ছিল। আমি আর বাচ্চু দুজনেই এটা বাজাতাম। বেশিরভাগ সময় শো করে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেত। আমরা তখন নিউ মার্কেটের একটি দোতলা বাড়িতে থাকতাম। আমরা থাকতাম দোতলায় আর বাড়িটির নিচে কাচারি ঘরে থাকতো নিরাশ্রয়ী অর্থাৎ যারা ভিক্ষুক, যাদের কোথাও থাকার জায়গা নেই তারা ওই ঘরটিতে রাতে ঘুমাতো।

রাত দেড়টা-দুইটায় যখন বাসায় ফিরতাম তখন ভিক্ষুকদের সঙ্গে ওই কাচারি ঘরে ঘুমাতাম। এমনও হয়েছে যে, শীত লাগছে তখন ভিক্ষুকের কম্বল টেনে গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছি। আমার মনে আছে- বাচ্চু, মুহম্মদ আলী, রিজভী ও আমি একসঙ্গে ওখানে ঘুমিয়েছি।

মা একদিন বুঝতে পারেন, আমরা বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু বাবার ভয়ে ঘরে ঢুকতেছি না। তখন মা নিচে এসে লাইট জ্বেলে দেখেন- আমি আর বাচ্চু ভিক্ষুকদের সঙ্গে ঘুমাচ্ছি। তারপর আমাদের ডেকে নিয়ে উপরে গেলেন। উপরে উঠে বাতি না জ্বালিয়ে আমরা আস্তে আস্তে রুমে ঢুকে যাই। তারপর মা খাবার দিলেন, খাবার খেয়ে আমার সিঙ্গেল খাটে একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ি।

আমাদের অর্থের চিন্তা-ভাবনা ছিল না। কীভাবে আমাদের জীবন চলবে সে চিন্তাও আমাদের ছিল না, চিন্তা ছিল একটাই- আমরা মিউজিক করবো।

দীর্ঘ যাত্রাপথে আমি আর বাচ্চু একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। দীর্ঘপথের সহযাত্রী আসলে শুধু বন্ধু থাকে না পরিবার হয়ে যায়। ভাইয়ের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। তখন ওই মানুষটি চলে গেলে, তা মানা যায় না। ভাবা যায়, বাচ্চুকে আর কোনো দিন দেখবো না!

আরও পড়ুন