বাংলাদেশ কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে?

শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও মানসিকভাবে বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকতে পারি না। মাঝেমধ্যে যে দূরে থাকার চেষ্টা করিনি তা নয়, তবে শেষমেষ পারিনি। এই যেমন এখন ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জীবনী লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নিজেকে অনেককিছু থেকেই গুটিয়ে নিয়েছি। সমসাময়িক বিশ্বে শেখ হাসিনার মতো এত ঘটনাবহুল, বেদনায় মোড়া জীবনের অধিকারী আমি আর কোন রাজনৈতিক নেতা দেখিনি। আমার তাই মনে হয়েছে, সারা বিশ্বের মানুষের এরকম একজন নেত্রীর সম্পর্কে, এরকম একজন মানুষ সম্পর্কে জানা উচিত।

গত কয়েকদিন ধরে কাজটা ঠিকমতো করতে পারছি না। এর প্রধান কারণ বাসার সবার জ্বর। দিন দশেক আগে সন্ধ্যায় এক বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। পরেরদিন সেই বাসা থেকে জানানো হলো তাদের দুই বাচ্চাই কোভিড পজিটিভ। অচিরেই আমাদের চারজনেরও উপসর্গ দেখা দিল, যদিও কিট টেস্টে বারবার নেগেটিভ এসেছে। এখন আর কোভিডকে কেউ অতটা পাত্তা দেয় না, প্রায় সবারই ‘যা হবার তাই হবে’ মনোভাব। আমার চিকিৎসক বউ ছাড়া আর কেউই আমরা তাই আর ল্যাবরেটরি টেস্ট করাইনি। কোভিড হোক না হোক, সপ্তাহখানেক বেশ ভুগলাম।

এই সময়ে পত্রিকা পড়ে এবং ফেসবুকেও বেশ সময় কাটালাম। ফেসবুকে কিছু মানুষের স্ট্যাটাস ও মন্তব্য পড়ে তো খুবই টেনশনের পড়ে গেলাম। তাদের কথাবার্তা আর ভাবসাবে মনে হয় বাংলাদেশ বোধ হয় একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। সেই সাথে আছে বিএনপি মহাসচিব শ্রদ্ধেয় মির্জা ফখরুল ইসলামের ভিত্তিহীন কথাবার্তা। কদিন আগে তিনি বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে দিলেন। বুঝতে পারি না এটা কি ওনার কথার কথা নাকি এটাই ওনার রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিধি? উনি কি ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা জানেন না?

 

এখন তো অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ, আঙ্গুলের ডগায় পৃথিবী। একটু কষ্ট করে গুগলে খোঁজ করলে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় তথ্যই পাওয়া যায়। তার পরেও কেন মিথ্যাচার, মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঘোলাজলে শিকারের ব্যর্থ চেষ্টা? বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা কি আসলেই খুব ভঙ্গুর? বাংলাদেশ কি মেগাপ্রজেক্ট করতে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ নিয়ে ফেলেছে? শুধু কি বাংলাদেশেই মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপক বেড়েছে?
ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক্স ও ট্রেডিং ইকোনোমিক্সের ওয়েবসাইটে গিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার এবং তাদের জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণ দেখলাম।

ট্রেডিং ইকোনোমিক্সের ওয়েবসাইট অনুযায়ী বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতির হার ৭.৫৬ শতাংশ। এবার বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশের বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির অবস্থাও একটু জেনে নেই। বর্তমানে অন্যান্য দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার এরকম: আমেরিকার ৯.১ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ৯.৪ শতাংশ, জার্মানি ৭.৫ শতাংশ, কানাডা ৮.১ শতাংশ, রাশিয়া ১৫.৯ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৬.১ শতাংশ, নেপাল ৮.৫৬ শতাংশ, ভুটান ৫.৯৫ শতাংশ, কম্বোডিয়া ৭.২ শতাংশ , থাইল্যান্ড ৭.৬১ শতাংশ, ভারত ৭.০১ শতাংশ, পাকিস্তান ২৪.৯ শতাংশ, মায়ানমার ১৭.৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৪.৯৪ শতাংশ, সৌদি আরব ২.৩ শতাংশ, ইরান ৫৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৬০.৮ শতাংশ, এবং তুরস্ক ৭৯.৬ শতাংশ।

আমি অর্থনীতিবিদ না হলেও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে টুকটাক অর্থনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে জানতে হয়। এসব কাজ করতে গিয়েই জেনেছিলাম, কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলে সেখানে মুদ্রাস্ফীতির হারও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ অনেকদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখি। সুতরাং, একারণে মূল্যস্ফীতির হারের কিছুটা বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে গত কয়েকমাসে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতির হার অনেক বেড়েছে। এই বৃদ্ধির কারণ কী? অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। তবে দুই বছরের কোভিড সংকটের পর রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ যে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়িয়ে দিয়েছে, তা বুঝতে অনেক বড় অর্থনীতিবিদ হবার প্রয়োজন নাই। রাশিয়া-ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের কারণে ইউরোজোনের মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ তো পৃথিবীর বাইরের কোন দেশ নয়, চাইলেই কি আমরা যুদ্ধের এই বিরূপ প্রভাব এড়াতে পারি?

এবার ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক্সের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম বিশ্বের কোন দেশের জিডিপির তুলনায় তাদের ঋণের পরিমাণ কত। এই অনুপাত দেখে কোন দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বোঝা যায়। বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৩১.৭ শতাংশ। বাংলাদেশের কোন পত্রিকায় এই পরিমানকে ৪১ শতাংশ বলা হয়েছে। এই ঋণের কিছুটা বৈদেশিক উৎস থেকে, বাকিটা দেশীয় সূত্র থেকে নেওয়া। অর্থনীতির ভাষায়, যে কোন দেশের ঋণ জিডিপির ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হলে তা গ্রহণযোগ্য। এবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে জিডিপির কত শতাংশ ঋণ তা জেনে নেই: চীনের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৬৬.৮ শতাংশ, জাপানের ক্ষেত্রে ২৬৬.২ শতাংশ, ভারতের ক্ষেত্রে ৭৩.৯৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ৩৮.৫ শতাংশ, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ৩২.৫ শতাংশ, থাইল্যোন্ডের ক্ষেত্রে ৫০.৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে ১৩১ শতাংশ, ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ৪৬.৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ১০১ শতাংশ, মায়ানমারের ক্ষেত্রে ৪২.৪ শতাংশ, নেপালের ক্ষেত্রে ৩৭.৭ শতাংশ, ভুটানের ক্ষেত্রে ১৩৪.৯৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ৪৬.৭ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে ২৪.৮ শতাংশ, নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে ৩০.১ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ৯৫.৯ শতাংশ, জার্মানির ক্ষেত্রে ৬৯.৩ শতাংশ, ইতালি ১৫০.৮ শতাংশ, রাশিয়ার ক্ষেত্রে ১৮.২ শতাংশ, গ্রীসের ক্ষেত্রে ১৯৩.৩ শতাংশ, আমেরিকার ক্ষেত্রে ১৩৭.২ শতাংশ, এবং কানাডারে ক্ষেত্রে ১১৭.৮ শতাংশ।

উপরের দুটো সূচক দেখলে বোঝা যায়, বিশ্বের বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশ বিবেচনায় নিয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। তারপরও সবার সতর্ক থাকার সময় এখন। পৃথিবীর সামনে এখন নানামুখি অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বিশ্ব অর্থনীতি আগামীতে আরো খারাপের দিকে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপেও তাদের সতর্ক মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা এই মুহূর্তে জরুরি।

কোভিড ও যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেরই মানুষই এখন কষ্টে  আছে। স্বভাবতই বাংলাদেশের মানুষও কষ্টে আছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে থেকে আমরাও কিছুটা কষ্টে আছি। গাড়ির তেলের দাম অনেক বেড়েছে। সপ্তাহের বাজার করতে গেলে টের পাই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে বেশ। তাই বলে অস্ট্রেলিয়ার রাজপথে কি বিক্ষোভ হচ্ছে? ফেসবুকে সরকারকে তুলোধুনা করা হচ্ছে? এর কিছুই হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হলো সরকার এবং বিরোধীদলগুলোর পক্ষ থেকে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা হচ্ছে এবং এর থেকে উত্তরণের কার্যকর পথ খোঁজা হচ্ছে। সরকার এবং নীতিনির্ধারকরা এখানে সাধারণ মানুষের প্রতি যথেষ্ট সহমর্মী। যদিও বাংলাদেশের সাথে অন্য কোন দেশের তুলনাই আমাদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তা যত যৌক্তিক এবং প্রাসঙ্গিক হোক না কেন।  অথচ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক হলেও বাংলাদেশের কিছু মানুষ দেশটা এই বুঝি শ্রীলঙ্কা হলো ভেবে ইতিমধ্যেই এক ধরনের গোপন আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করেছেন।

গত তেরো বছরে শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভাবিত উন্নয়ন হয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। তার মধ্যে একটা হলো ব্যাংকিং খাত। অনেক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমত লুটপাট করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বারবার দুনীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলেও বাস্তবে রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি খুব একটা কমেছে বলে মনে হয় না। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু প্রতিষ্ঠানের রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণও কম নয়। বিদেশে অর্থ পাচারে আমরা রাজনৈতিক নেতাদের গালি দিলেও কতিপয় দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী এবং আমলারাই এক্ষেত্রে প্রধানত এগিয়ে। এসবের সাথে আছে গণপরিবহন খাতের নৈরাজ্য। পাশাপাশি আছে কয়েকজন মন্ত্রীর মুখের লাগামহীন কথাবার্তা। এসব কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে। বর্তমান পৃথিবীর এই অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ চায়, দেশের মন্ত্রী-নেতারা কথাবার্তায় সংযত হবেন, তাদের প্রতি সহমর্মী হবেন।

বাংলাদেশের কথা মনে হলে আমার আজকাল সেই গ্লাসটার কথা মনে পড়ে, যার আধেক পানিতে ভরা আর আধেক খালি। এক যুগ আগেও এই দেশটার নাম সারা পৃথিবীর মানুষ তেমন জানতো না। যারাও বা জানতো, তাদের কাছে গরিব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দেশ হিসেবেই মূলত পরিচিত ছিল দেশটা। সেখানে থেকে এক যুগের ব্যবধানে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোটা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। গরিব দেশের তকমা থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে আজ সমীহ জাগানো একটা নাম। এর জন্য অবশ্যই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে কৃতিত্ব দিতে হবে। কৃতিত্ব দেবার পাশাপাশি এখনো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেশটাকে। সব মিলিয়ে আধেক ভরা, আধেক খালি গ্লাসের মতোই অবস্থা। এ অবস্থা মোকাবেলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নিয়ন্ত্রণযোগ্য যেসব সীমাবদ্ধতা আছে, তাও কার্যকরভাবে অতিক্রম করতে হবে। সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই পারবে, গত এক যুগের অভিজ্ঞতায় এটুকু তো বলাই যায়। শেখ হাসিনার উপর আস্থা রাখা যায়। বাংলাদেশের অকল্যাণ কামনা করে ফেসবুকের অযৌক্তিক, অপ্রাসঙ্গিক, ভুল পরিসংখ্যানে ভরা আলোচনায় কারো কিছু যায় আসবে না।

লেখক : কবি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন