বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারে মাইলস্টোন হবে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ২৫ জুন। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে ভারতের গণমাধ্যমগুলোতেও পদ্মা সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখতে পাচ্ছি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে তো পদ্মা সেতু নিয়ে প্রবল আগ্রহ ও খুশির ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে পদ্মা সেতু চালু হলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের খুশি হওয়ার কারণ কি? বিষয়টি প্রথম মাথায় না আসলেও গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন দেখে কারণটা বুঝতে পেরেছি। আসলেই তো পদ্মা সেতু দু’দেশের মানুষের কাছেই আবেগ, উচ্ছাস ও আনন্দেরই হওয়ার কথা। শুধুমাত্র দুই দেশেরই নয়, পদ্মা সেতু এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনবে গতি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

বাংলাদেশ-ভারত শুধুমাত্র বন্ধুপ্রতীম দুটি রাষ্ট্রই নয়, দু’দেশের আছে দীর্ঘ সীমান্ত সীমানা। যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম ভূমি সীমানা। ৪১৫৬ কিমি দীর্ঘ সীমানার মধ্যে আছে পশ্চিমবঙ্গ ২২১৭ কিমি, আসাম ২৬২ কিমি, ত্রিপুরা ৮৫৬ কিমি, মিজোরাম ১৮০ কিমি, মেঘালয় ৪৪৩ কিমি।

বাংলাদেশের মোট সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলার মধ্যে ৩০ টি জেলার সাথে রয়েছে ভারতের সীমান্ত সীমানা। বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের অবস্থান। ভৌগোলিক দিক বিবেচনা করলে দু’টি দেশের সুসম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুরু হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে। বন্ধুত্বের নির্দশন হিসেবে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি চুক্তি। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে সম্পর্কে আবার ছন্দপতন ঘটে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুনভাবে শুরু হয়। বিশেষ করে ২০১৫ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন এক মাত্রা যোগ হয়। একে একে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হতে শুরু করে। দু’দেশের ছিটমহল সমস্যা, সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তিসহ জটিল বিষয়গুলোরও সমাধান হয়।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে দুই দেশের মধ্যে অতীতে বিদ্যমান সকল রেল ও সড়ক সংযোগগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে, আরো নতুন নতুন পথে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-আগরতলা, ঢাকা-শিলং, ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং, খুলনা-কলকাতা রুটে বাস ও রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। ফেনী নদীতে মৈত্রী ব্রিজ চালু করে বাংলাদেশ ও ত্রিপুরাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। শুধুমাত্র সড়ক ও রেলই নয়, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে ব্যবহার করে নৌপথেও যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যকার আঞ্চলিক সহযোগিতা বদ্ধিৃর ক্ষেত্রে এই দুটি দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির মতো নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দিন দিন আরো বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত দুইটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ‘ব্যবসায়িক পাটনার’। গত এক দশকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলছে।

২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশের রফতানি আয় তিনগুণ বেড়ে ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশের এই রফতানির পরিমাণ বেড়ে দাড়ায় ১.২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিগত তিন বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে ভারতে পণ্য রপ্তানী ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি ) ডলারের বেশিও মূল্যের পণ্য রপ্তানী হয়েছে। প্রতিবছরই জ্যামিতিক হারে
রপ্তানী বেড়েই চলছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানীর পরিমান ছিল মাত্র ২৭ কোটি ৬৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, আমদানির পরিমান ছিল ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য। সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানীর পরিমান গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১২৮ কোটি ডলার।

আমদানির পরিমান ৮৫৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের পণ্য। আর চলতি বছরের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত সাত মাসে ১২১ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার ডলারের পন্য রপ্তানী হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বছর শেষে ২ বিলিয়ন (২০০কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই দুটি দেশের বানিজ্য দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল মোটরযান চুক্তির মাধ্যমে পণ্য বহনকারী যানবাহনগুলোকে সীমান্ত ধরে চলাচলের অনুমতি দেয়ার ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পরিবহন খরচ কম হচ্ছে। ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশ তার স্থলভাগ ব্যবহারের অনমুতি দিয়েছে। ভৌগোলিকভাবে ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গেটওয়ে হবে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক বাণিজ্য, ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সহজীকরণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের সুপার পাওয়ার হাউজ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের।

গত এক দশকে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্য বাড়লেও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে সম্ভাবনার চেয়ে কম বাণিজ্য হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানী ২৯৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানী ১৭২ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা আছে । বিশ্ব ব্যাংকের মতে, নির্বিঘ্ন পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ অন্যদিকে ভারতের ৮ শতাংশ জাতীয় আয় বাড়বে। পদ্মা সেতুর কারনে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে উঠবে। গার্মেন্টসসহ রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাবে। দিনের পণ্য দিনের মধ্যেই পৌঁছানোর কারনেই শিল্প ক্ষেত্রে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকটাই দুই দেশের স্থলবন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বেনাপোল ও ভোমরা বন্দরে প্রথম বছরেই দ্বিগুন রাজস্ব বাড়বে। এছাড়া ভারত মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে তাদের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবে। তাতে ভারতের যেমন পন্য পরিবহন সহজ হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় বদ্ধিৃ পাবে। সেই সঙ্গে সমদ্ধৃ হবে জাতীয় অর্থনীতির চাকা।

বাংলাদেশে থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি পর্যটক ভারতে প্রবেশ করে। যাদের অধিকাংশই চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণে যান। পদ্মাসেতুর কারনে ঢাকা-কলকাতার সময় বাঁচবে কমপক্ষে ৪-৫ ঘণ্টা। স্বাভাবিকভাবে দু’দেশেরই পর্যটকের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। ভারতের পর্যটকেরা বাংলাদেশের জাতির সমাধিস্থল টুংগীপাড়া, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন সহ অনেক দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে আসার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে পদ্মাসেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশ অন্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। আর বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের অবস্থান থাকার কারনে এমন প্রতিবেশীকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পারস্পারিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে দুদেশের মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারিত করতে পারলে দইু দেশই উপকৃত হবে। পদ্মা সেতু দুই বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের মানুষদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো সহজ করে দিবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারেও মাইলস্টোন হবে পদ্মাসেতু।

 

আরও পড়ুন