মার্চ মাস নানাভাবেই স্মরণীয়

আমরা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের কবলমুক্ত হয়ে ভেবেছিলাম যে, আমরা স্বাধীনতা পেয়ে গেছি; কিন্তু অচিরেই আমাদের সেই ভাবনা দূরীভূত হয়ে যায় পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা’ জিন্নাহ সাহেব যেদিন উর্দুকেই সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করলেন। আমরা বুঝলাম—এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই আমাদের বাঙালিদের স্বাধীনতা অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা রুখে দাঁড়ালাম এবং ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার উপকূলে পৌঁছালাম এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করলাম ১৯৭১ সালে।

আরও পড়ুন:

২৬ মার্চ ঢাকা-জলপাইগুড়ি ট্রেন উদ্বোধন করবেন হাসিনা-মোদি

 

১৯৭১ সালের মার্চ মাসটি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে নানাভাবেই স্মরণীয়। এই মাসেরই ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই স্বাধীনতার সংগ্রামে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা জয়লাভ করেছিলাম। স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে ২৬শে মার্চ ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের জন্য পুঁজিবাদবিরোধী অর্থনৈতিক নীতিমালা ঘোষণা করেছিলেন; কিন্তু আসলে তার এই ঘোষিত অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রতি দেশের প্রভাবশালী লোকদের কোনোই সমর্থন ছিল না। এমনকি তার দলের মধ্যেও অবস্থান করেছিলেন নীতিমালাবিরোধী নেতৃবৃন্দ। খন্দকার মোশতাক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের মার্কিন কানেকশন ছিল ওপেন সিক্রেট; কিন্তু খন্দকার মোশতাকের মতো অনেক কুশলী ও কৌশলী লোকদের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে বরবাদ করে দিতে সচেষ্ট হয় এবং তাদের সেই অপচেষ্টা অচিরেই ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। সাড়ে তিন বছরের মাথায়ই তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যার পেছনে যারা ছিল তারা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম চলার সময়েই স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে দেবার চেষ্টাও করেছিল; কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।

আরও পড়ুন:

পতাকা উত্তোলন দিবস আজ

 

১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয়। অনুষ্ঠানে প্রচ্ছন্নতা না রেখেই খোলাখুলি তিনি মার্কিনবিরোধী কথা উচ্চারণ করেছিলেন। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান একটি লেখায় লিখেছিলেন—উক্ত সম্মেলনে বক্তৃতার পর ফ্রিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘শেখ পৃথিবীময় আপনি শত্রু সৃষ্টি করলেন, এমনকি আমাদের মধ্যেও।’ অনেক দেশ নামকাওয়াস্তে জোট নিরপেক্ষ, আসলে সবাই এদের লেজুড়। এই লেজুড়দের হাতেই বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়। তাই স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রম হতে যাওয়ার পর আমাদের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে যে আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত উত্তরাধিকার বহনে সক্ষম হব। তাই বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী বলে নিজেদের ব্যক্ত করেন যারা, তাদেরকে অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে দৃঢ় থাকতে হবে।

বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের জন্য যে চার মূলনীতি ঘোষণা করেছিলেন সেগুলোর প্রতিষ্ঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমরা হূদয়ে স্থান করে নিতে না পারি। এই বিষয়ে আমাদের অবশ্যই আরো অনেক কথা বলবার আছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী

 

আরও পড়ুন