মিন্নি আমার পুত্রবধূ নয়, সে নয়ন বন্ডের স্ত্রী: দুলাল শরীফ

রিফাত শরীফের (২২) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনও সারাদেশ চলছে শোকের মাতম। স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে খুন করল নয়ন বন্ড বাহিনী। আর সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শ খানেক মানুষ। এ ঘটনায় উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক।

এদিকে রিফাত শরীফ হত্যার মূল নায়ক সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ডের মৃত্যুর পর বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে।

রবিবার (২৮ জুলাই) বিকেলে রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ প্রিয় ছেলে হারানোর কষ্ট নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আরজি জানান।

দুলাল শরীফ বলেন, আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আমার পুত্রবধূ নয়। আপনারা বার বার কেন লিখেন, রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি। এ লিখায় আমি ভীষণ কষ্ট পাই। একটা মেয়ের জন্য দুটি ছেলের জীবন চলে গেছে। অনেকগুলো পরিবার হত্যায় জড়িত হয়েছে। আপনারা কোনোদিন এটা আর লিখবেন না।

তবে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, দুলাল শরীফ (রিফাত শরীফের বাবা) মানসিকভাবে অসুস্থ। তার কথায় আপনারা কান দেবেন না।

এদিকে, রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. হুমায়ূন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, আসন্ন কোরবানির ঈদের (ঈদুল আজহা) আগেই এ মামলার চার্জশিট আদালতে দিতে পারবো। আমাদের সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। এখনও এজাহারভুক্ত যে ৪ জন আসামি পলাতক তাদের গ্রেফতার করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিন রিফাতে বাবা দুলাল শরীফ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক হাতে নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমি বারবার বলেছি। তারপরও আমি যখন দেখি আপনারা লিখেন- মিন্নি আমার পুত্রবধূ। তখন কষ্টে আমার বুকটা ফাইটা যায়। ছেলে হারানোর বেদনায় কাতর এই বাবা বলেন, আমি পুত্রশোকে কাতর। ওই মিন্নির কারণে আমার একমাত্র ছেলে রিফাত শরীফকে নয়ন বন্ড গ্রুপ নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

তিনি আরও বলেন, আমি যদি জানতাম মিন্নি নয়ন বন্ডের (সাব্বির আহমেদ নয়ন) স্ত্রী, তাহলে আমি কিশোরের (মিন্নির বাবা) মতো সুদখোরের মেয়ের সঙ্গে পাতানো বিয়েতে রাজি হতাম না।

নয়ন বন্ড ও মিন্নির বিয়ের কাবিননামা দেখিয়ে দুলাল শরীফ বলেন, দেখুন এই হল তাদের বিয়ে কাবিননামা। রেজিস্ট্রি নম্বর ১৪৫/২০১৮। বরগুনা পৌরসভার ৪-৫-৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। আমার ছেলেকে খুনের পরই এ কাবিননামা জনসম্মুখে চলে আসে। কই মিন্নির বাবা তো প্রতিবাদ করেন নি। আমি ওই কাজী আনিসুর রহমান ভূঁইয়ার কাছে গিয়ে কাবিনের সত্যতা জেনে এসেছি। আজ পর্যন্ত মিন্নির বাবা মিন্নি ও নয়ন বন্ডের তালাকনামা দেখাতে পারেনি। আপনারাই বলেন, মিন্নি কী করে আমার পুত্রবধূ হয়।

দুলাল শরীফ আরও বলেন, মিন্নি-নয়ন ১৫ অক্টোবর ২০১৮ বিয়ে করে। সেই বিয়ে বলবৎ থাকাকালে কিশোর তা গোপন করে রিফাত শরীফের সঙ্গে ২৬ এপ্রিল ২০১৯ আবার বিয়ে দেয়। আমি বরগুনা জেলার নামি-দামি মাওলানাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছি। তারা বলেছেন, একটি নারীর দুটো বিয়ে হতে পারে না। নারীর বিয়ে বলবৎ থাকাকালে অন্য কাউকে বিয়ে করলে সেই বিয়ে ফাসিক হয়।

এ বিষয়ে মাওলানা আলতাফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ফাসিক’ শব্দের অর্থ বাতিল। একজন পুরুষের ৪ স্ত্রী থাকতে পারে। কিন্তু এক নারীর একইসঙ্গে একাধিক স্বামী থাকা শরিয়তে নেই।

চোখ মুছতে মুছতে নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বলেন, আমার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারছি না। আমি বাড়িতে যেতে পারি না। আমার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। রিফাতের কথা মনে করে সে বারবার জ্ঞান হারায়। দিনে দু-তিনবার ছেলের কবরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। আমার ঘরে রান্না হয় না। একমাত্র কন্যা মৌ তার ভাইয়ের শোকে পাথর হয়ে গেছে। আমার পক্ষে কেউ নেই। আমি কী করে কাকে নিয়ে বেঁচে থাকব। আমার একমাত্র অবলম্বন আজ নেই। আমি আমার মনকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না।

অথচ আপনাদের মত মিডিয়ার লোক মিন্নির মতো একজন খুনির জন্য মায়াকান্না করছেন। তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন পত্রিকা দেখে লজ্জা পাই। মনে হচ্ছে খুন হয়েছে মিন্নি। আমার ছেলের জন্য কারও দরদ নেই। সব দরদ মিন্নির জন্য। তিনি বলেন, ওই মিন্নির জন্য আমার ছেলে খুন হয়েছে। মিন্নি খুনি…।

অপরদিকে, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর রবিবার (২৮ জুলাই) গণমাধ্যমকে বলেন, দুলাল শরীফের মাথা ঠিক নেই। মিন্নি রিফাত শরীফের স্ত্রী না হলে ওই দিন (২৬ জুন) আমি কেন আমার জামাইকে নিয়ে বরিশাল গেলাম। আমি জামাইয়ের জন্য অনেক টাকা ব্যয় করেছি। সারা রাত সজাগ ছিলাম। আমার জামাই না হলে কেন আমি এত কষ্ট করতে যাবো। এভাবেই বলছিলেন মিন্নির বাবা কিশোর।

কাবিননামা নিয়ে মিন্নিকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে কিশোর বলেন, আমার মেয়ে মিন্নি বারবার বলেছে, নয়ন আমাকে জোর করে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে।

এ বিষয়ে কাজী আনিসুর রহমান ভূঁইয়া বলেছেন, মিন্নি ও নয়ন রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছে। সেই বিয়ের তালাক না দিয়ে আবার কেন বিয়ে দিলেন? জবাবে কিশোর বলেন, এটা কোনো পাগলেও করে না।

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, দুলাল শরীফ ভুয়া কাবিননামা বানাইছে। এটা হতে পারে না। আমরা তো মুসলমান। আমরা তো সমাজে বসবাস করি।

তিনি আরও বলেন, রিফাতে বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ হয়তো কারও পরামর্শে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিতেছেন।

উল্লেখ্য, শনিবার (২৭ জুলাই) জেলগেটে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির দেখা করেন তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। ব্যাপক নজরদারির মাঝে মা-মেয়ের মধ্যে মাত্র ৪ মিনিটের কথা হয় তাদের মাঝে।

সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কিশোর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার মেয়ে খুবই অসুস্থ। মেয়েকে দেখে চিনতে পারিনি। আমার মেয়ের দিক চাওন যায় না। মেয়ের সঙ্গে একটু কথা কমু তাও পারি না। গোয়েন্দারা গায়ের সঙ্গে দাঁড়াইয়া থাকে। মিনিট চারেক কথা কইয়া রাগ করিয়া চইলা আসি। মিন্নি কয়, ‘আব্বু আমি আর বাঁচব না।’ আমার সন্দেহ, আমার মাইয়াডারে জীবিত বাইর করতে পারুম কিনা জানি না।’

কিশোর বলেন, ‘মিন্নি একেবারে কাহিল হইয়া গেছে। ও বলেছে, তার মাথায় ও বুকে ব্যথা। সারা শরীরে ব্যথা। মিন্নি খুবই দুর্বল।’

আরও পড়ুন