যেভাবে পদবঞ্ছিত হলেন শোভন-রব্বানী

গতকাল শনিবার আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের বিষয়টি আলোচনায় উঠলে সাংগঠনিক অভিভাবক শেখ হাসিনা নানা অভিযোগ ও সমালোচনার মুখে থাকা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সংগঠনের ১ সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন তিনি।

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। বৈঠক থেকে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পরই শুরু হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে ছাত্রলীগ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসলে প্রধানমন্ত্রী দুই শীর্ষ নেতাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘শোভন-রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। পদাধিকার বলে আল নাহিয়ান খান জয় ছাত্রলীগের ১ নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। আর লেখক ভট্টাচার্য ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকায় তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন। তারা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’

গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই শেষ হয় ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন। পরে ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেট ভেঙে প্রধানমন্ত্রী কমিটি দেয়ায় শোভন-রাব্বানীর প্রতি আলাদা নজর ছিল আওয়ামী লীগের সব মহলের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশাকে আমলে না নিয়ে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন তারা।

সংগঠনের মধ্যে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। চাঁদা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের কনসার্টে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে মাফ পায় তারা। কমিটি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, দেরিতে ঘুম থেকে উঠা, মাদক সিন্ডিকেট, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বিতর্কিতদের স্থান দেয়া, নিজেদের অনুষ্ঠানে অতিথি করেও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ, ডা: দীপু মনি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ থেকে চাঁদা দাবি নিয়ে সম্প্রতি সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ছাত্রলীগ। প্রায় ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির নালিশের পরই ক্ষুব্ধ হন শেখ হাসিনা। এরপরই গণভবনে শোভন-রাব্বানীর প্রবেশের স্থায়ী পাস স্থগিত করা হয়।

এ দিকে ছাত্রলীগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের চার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, বি এম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সাথে কয়েক দফায় সাক্ষাৎ করেও সেখান থেকে তেমন কোনো আশারবাণী পাননি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। এর বাইরে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় অন্তত ১০ নেতার কাছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ধর্ণা দিয়েও হতাশ হয়েছেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করে একটি চিঠি লেখে সকল কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চান গোলাম রাব্বানী। এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি দুই শীর্ষ নেতৃত্বের।

আরও পড়ুন