যে গ্রামে আত্মহত্যা করতে যায় শত শত পাখি

ভারতে এমন একটি গ্রাম আছে যেখানে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সেই গ্রামে কোনও আলোর উৎসের কাছাকাছি শত শত পাখি ঝাপ দিয়ে আহত হয়ে মারা যায়।

আসামে ২৫০০ লোকের এক ছোট্ট গ্রাম, জাতিঙ্গা। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে যেখানে চলে আসছে এই অদ্ভুত ভূতুড়ে ঘটনা। বর্ষা শেষের পর আগস্টের শেষদিক এবং মূলত সেপ্টেম্বর মাসের অমাবস্যাগুলিতে বিকেল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলতে দেখা যায় এই অদ্ভুত ঘটনা। শত শত পাখি এসে ঝাঁপ দেয় আলোর উৎসগুলিতে। ধাক্কা খেয়ে আধমরা অবস্থায় পরে থাকে মাটির উপর।

মূলত আত্মহত্যার প্রবণতা ভাবা হলেও, পাখিগুলি এভাবে মারা যায় না। বছরের পর বছর ধরে গ্রামবাসীরা এই সময় এবং দিনগুলিতে সেই আধমরা পাখিদের বাঁশের হাতিয়ার দিয়ে পিটিয়ে মেরে তাদের ঝলসে খাওয়ার উৎসব চালিয়ে গেছেন।

সাল ১৯০৫। বাঘে মেরে দিয়ে যাওয়া একটি গরুর মৃতদেহ খুঁজতে বেরিয়ে রাতের অন্ধকারে গ্রামবাসীরা দেখতে পান ঝাঁকে ঝাঁকে পড়ে থাকা পাখি। তাদের অধিকাংশই অর্ধমৃত। অদ্ভুতভাবে এগুলিকে দেখাও যায় কোনও না কোনও আলোর উৎসের কাছাকাছি।

সমীক্ষা বলে, এই ঘটনায় আহত হয় প্রায় ৪৪টির মতো প্রজাতি ও উপপ্রজাতির পাখি। কোনও এক বিষয় নিয়ে বিব্রত হওয়া এই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি নিজেরা গিয়ে ঝাঁপ দেয় গ্রামের আগুনে, ও আলোয়।

তবে প্রতিবছরের এই বিপুল পরিমাণ পাখির বসবাস মোটেও ওই গ্রামে নয়। বরং বেশ খানিকটা দূর থেকেও উড়ে আসে তারা এই ১৫০০ বাই ২০০ মিটারের মৃত্যুস্থলে। বিষয়টা অবশ্যই ৩০ বছর আগের মতো নেই। গ্রামবাসীদের নানাভাবে বুঝিয়ে কমানো গেছে পিটিয়ে মারা এবং ঝলসে খাওয়ার পাশবিক উপক্রম। কিন্তু কমানো যায়নি মৃত্যুর হার। বহু চেষ্টাতেও এই পাখিগুলিকে বাঁচানো সম্ভব হয়ে ওঠে না এখনও।

১৯৭৭ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে অর্নিথোলজিস্ট সুধীন সেনগুপ্তকে পাঠানো হয় এই গ্রামে। একাধিক বছর ধরে, ঘটনার কিছুদিন আগে থেকে বেশ কিছুদিন পর পর্যন্ত ওখানে থাকেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা ‘সায়েন্স’-এর পক্ষ থেকে তাঁকে এই বিষয়ে তাঁর রিসার্চটি লিখতেও বলা হয়।

সুধীনবাবুর প্রথম পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, কুয়াশা এবং বৃষ্টির ফোঁটার উপর আলোকপাতের দরুণ তৈরি হয় প্রাথমিক বিভ্রম। এবং আরও অদ্ভুত বিষয় তিনি লক্ষ্য করেন প্রতিটি আহত পাখিই তাদের শেষবার খাওয়ার প্রায় তিনঘণ্টা পরে এসে ঝাঁপ দেয় আলোয়। অর্থাৎ আহত হওয়ার সময় তাদের অধিকাংশেরই পেট খালি থাকে এবং পেশিতে সংকোচন শুরু হয় দ্রুত। এরপর জোর করে খাওয়াতে চাইলে তারা প্রত্যাখ্যান করে এবং অধিকাংশই পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণ হারায়। তাঁর গবেষণা বলে আহত প্রতিটি পাখি ডে’টাইম ফিডার।

বহু তথ্যই সংগ্রহ করেন সুধীন সেনগুপ্ত ও তাঁর দল। কিন্তু বিশেষ প্রশ্নগুলির কোনও উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কেন কেবল জাতিঙ্গার মতো ছোট একটি জায়গায় ঘটে এই বিরাট মৃত্যুযজ্ঞ, কেন এই অস্বাভাবিক আচরণ করে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, কেন আলোক উৎসের দিকে ঝাঁপ দেয় তারা? কেনই বা খালিপেটে থাকাকালীন এমন আচরণ তাদের? কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

বেশ কিছু থিওরির মধ্যে বলা হয় এটি একপ্রকার জিও ম্যাগনেটিক ফল্ট। পৃথিবীর ভৌগলিক মেরু ও চৌম্বক মেরুর অবস্থান পার্থক্যের কারণে উৎপন্ন কোনও শক্তি তাদের বিব্রত করতে পারে বলে মনে করা হয়।

রিদম কনসেপ্ট নামক সাম্প্রতিকতম ব্যাখ্যা থেকে ধারনা করা হয়, খাওয়ার পরে বিশ্রামরত পাখিরা বিক্ষিপ্ত আলোর প্রভাবে অসময়ে সূর্যোদয় ভেবে বসে। আলোর এই অস্বাভাবিক বিচ্ছুরণের জন্য দায়ী কুয়াশার স্তর। ফলে, দিকনির্ণয়ের সমস্ত উপায় ঘেঁটে যায় পাখিদের এবং তারা ছুটে যায় আলোর উৎসের দিকে। নিজেদের সমস্ত ইন্সটিংকট ঘেঁটে যাওয়ায় কাটা ঘুড়ির মতো দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়ে তারা।

ব্যাখ্যা কিছু পাওয়া গেলেও কোনওটিকেই একমাত্র কারণ বলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি আজও। সমতল থেকে ৭৩০ মিটার উঁচু এই গ্রামে ৫টি অমাবস্যা জুড়ে চলা এই রহস্যময় ঘটনা বিশ্বের কাছে অন্যতম এক আশ্চর্য বিষয় হয়েই রয়ে গিয়েছে এখনও। কোনও একদিন এই রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে বলেই আশা করা যায়।

আরও পড়ুন