শব্দদূষণ আর বায়ুদূষণ মেয়রদের সেরা অর্জন

ঢাকা। আমাদের প্রাণের ঢাকা। তীব্র যানজট, ঠাসা মানুষের চাপে দমবন্ধ জীবন। শ্বাস গ্রহণেই যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন। এর মধ্যে তীব্র শব্দের অত্যাচার। রাতের ঢাকায় ছিনতাইয়ের উৎসব। খানা-খন্দে আচমকা পড়ে সর্বনাশের শঙ্কা। রাস্তাঘাট, বাজারহাট, শপিং মল সর্বত্র মানুষের ভিড়। মানুষ মানুষের ওপর। তার পরও এ শহরেই আমরা আঁকড়ে থাকি। এ শহরে মরার মতো আমরা বেঁচে থাকি। কেউ চাকরির জন্য। কেউ চিকিৎসার জন্য। কেউ সন্তানের লেখাপড়ার জন্য। কেউ জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে এ শহরে। ঢাকা নিয়ে মানুষ আর ভাবে না। ঢাকার উন্নতি, বাসযোগ্য নগরী গড়ে ওঠা ইত্যাদি নিয়ে কোনো স্বপ্নও দেখে না। এ শহরের আবর্জনা, দূষণ আর অস্থিরতাকে আলিঙ্গন করে বেঁচে থাকাই হলো পরম সৌভাগ্য।

সম্প্রতি আমাদের এ শহর বিশ্বের দুটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। বায়ুদূষণে আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছি। আর এবার শ্রেষ্ঠ হলাম শব্দদূষণে। সুইজারল্যান্ডের দূষণ রোধকারী প্রযুক্তি সেবাদাতা সংস্থা আইকিউ এয়ারের ‘বিশ্ব বায়ুদূষণ প্রতিবেদনে’ ঢাকা প্রায়ই শীর্ষে থাকে। শীর্ষস্থান ধরে রাখার জন্য দিল্লির সঙ্গে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা করে। কখনো দিল্লি প্রথম, কখনো ঢাকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা শীর্ষস্থান মোটামুটি পাকাপোক্তই করে ফেলেছে। অন্যদিকে ৬১টি জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে শব্দদূষণে সম্প্রতি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে ঢাকা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২ : নয়েস, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকাকে শব্দদূষণের সেরা খেতাব দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঢাকায় বেশির ভাগ সময় শব্দের মাত্রা থাকে সহনীয় মানের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। এটি নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।’

দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে ঢাকাকে দুটি শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। এ স্বীকৃতি নিঃশব্দেই আমাদের আপ্লুত করেছে। এটি ঢাকা মহানগরীর দুই মহান ও কীর্তিমান মেয়রের অসাধারণ অর্জন। এজন্য আমরা তাঁদের সংবর্ধনা দিতেই পারি। ঢাকা মহানগরী বড় হয়েছে। এজন্য সরকার ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করে দুটি সিটি করপোরেশন গঠন করেছে বেশ ক’বছর আগে। দুই সিটিতে দুই মেয়র। দুজনই দারুণ করিৎকর্মা। টেলিভিশনের সৌজন্যে প্রতিদিনই তাঁদের নানা কসরৎ জাতি প্রত্যক্ষ করে। ঢাকাবাসীর মলিন জীবনে দুই মেয়র কিছুটা হলেও বিনোদনের খোরাক। দুই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কদিন আগেই এক অনুষ্ঠানে মেয়রদ্বয় নিজেরাই নিজেদের সফল বলে ঘোষণা করলেন। একজন মেয়র ঘোষণা করলেন, ‘আমরা দুই মেয়র মিলে শতভাগ সফল’। বাঃ বেশ! মেয়ররা যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তেমনি স্বঘোষিতভাবেই নিজেদের শতভাগ সফল ঘোষণা করলেন। মেয়রদের এ সাফল্যের ঘোষণায় শিহরিত হয়ে আমি অনুভবের চেষ্টা করলাম মেয়রদের কাজ কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়াটা সবচেয়ে নিরাপদ, ঝুঁকিহীন ও কর্মহীন পদ। মেয়রদের প্রথম কাজ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে অতিষ্ঠ জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলা। দ্বিতীয় কাজ হলো ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো। এই যে বায়ুদূষণ কিংবা শব্দদূষণ এ নিয়ে মেয়ররা অবলীলায় বললেন বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার জন্য এটা হচ্ছে। আমাদের কোনো দায় নেই। শুধু কথা আর আশ্বাস এবং কোনো বিষয়ে দায়িত্ব না নেওয়াই মেয়রদের কাজ। আমাদের দুই মেয়র নির্বাচনের সময় যেসব অঙ্গীকার করেছিলেন তার ১০ ভাগ বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তাঁদের নেই। আমাদের দুই মেয়রের কর্মধারা দুই ধরনের। একজন জনগণকে প্রতিপক্ষ এবং কখনোসখনো গিনিপিগ মনে করেন। জনগণকে ধমক দিয়ে ভয় দেখিয়ে বোঝাতে চান তিনি মেয়র। অন্যজন প্রশাসন এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের জন্য ত্রাস। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে সাফল্য খুঁজে বেড়ান। এই যে কদিন পর ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হবে। নানা বেশে মেয়রদ্বয় মাঠে নামবেন। জনগণকে হুমকি দেবেন। নালা, আবর্জনা, খানাখন্দে গিয়ে ফটোসেশন করবেন। নিজেই ফগার মেশিন নিয়ে মডেল হবেন। (গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে) অথচ আবর্জনা, খাল, নোংরা নর্দমা ইত্যাদি পরিষ্কার করা সিটি করপোরেশনের রুটিন কাজ। মিরপুর, মোহাম্মদপুরের মতো মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকার কথা বাদ দিন। গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকাগুলো এখন আবর্জনার ভাগাড়। এসব পরিচ্ছন্ন করার সময় নেই মেয়রদের। একজন এখন ব্যস্ত গাড়ির নম্বর প্লেট নিয়ে। জোড়-বিজোড় গাড়ি কবে কোনটা চলবে এমন অভাবনীয় আবিষ্কারের উন্মাদনায় কাঁপছেন আমাদের এক মেয়র মহোদয়। তাঁর আবিষ্কার এতই অভিনব যে তিনি নিজেই নিজেকে একটা পিএইচডি দিতে পারেন। ঢাকায় বিজোড় তারিখে যেমন ১, ৩, ৫ এসব দিনে বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চলবে। যেমন ১৫, ১৭, ১৯ সিরিয়াল। অথচ উত্তর সিটি করপোরেশনের সেবার তালিকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের কোনো কথাই নেই। কিন্তু উনি জোড়-বিজোড় তত্ত্ব দিলেন ঢাকাবাসীকে। মেয়রের এ আবিষ্কারের পর বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘ভাই, আমার গাড়ি ২০ সিরিয়ালের, আমি ব্যাংকে চাকরি করি। আমার স্ত্রী চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ছেলে এবং মেয়ে দুজন দুই স্কুলে। আমি সকালে বাচ্চাদের স্কুলে নামাই, তারপর স্ত্রীকে নামিয়ে অফিসে যাই। ড্রাইভার ছেলেমেয়েকে দুপুরে বাসায় নিয়ে যান। তারপর স্ত্রীকে নিয়ে যান। সেখান থেকে গাড়ি এসে আমাকে নিয়ে যায়।’ তাঁর প্রশ্ন, বিজোড় দিনে আমি কী করব? গণপরিবহনের কী হাল তা কি মেয়র সাহেব জানেন? ব্যাংকার ভদ্রলোকের ওই প্রশ্নে আমি লা-জবাব। সাধারণ মানুষ যখন যানজটে নাকাল হয়, তখন আমাদের মহান মেয়রগণ বলেন, ‘এটা আমাদের কাজ নয়’। যখন রাতে ব্যস্ত সড়কে নিরীহ শিক্ষার্থী সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যান তখন মেয়ররা নীরব। ভোরবেলায় ছিনতাইকারীদের ছুরিতে যখন নিরীহ নাগরিক মারা যান তখনো তাঁরা ভূমিকাহীন। বেপরোয়া চালকের হাতে যখন স্কুল শিক্ষার্থীর মা পিষ্ট হন তখন মেয়ররা নিশ্চিুপ। এ নীরবতার পক্ষে তাঁদের অকাট্য যুক্তি- ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মেয়রদের নয়। সড়ক দুর্ঘটনাও মেয়রদের কাজের মধ্যে পড়ে না।’ অথচ দুই মেয়রই তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ, বসবাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন। নিরাপদ শহর মানে কী? এমন একটি শহর যেখানে নারী-পুরুষ নির্ভয়ে চলাচল করতে পারবে। প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে। কষ্টহীনভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারবে। শিক্ষা, চিকিৎসা নিয়ে বিচলিত হবে না। একজন মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে পারবে। আমি সাদামাটাভাবে এটাকেই নিরাপদ নগরীর প্রতিচ্ছবি মনে করি। নগরপিতা বা মেয়রের দায়িত্ব যদি নিরাপদ নগরী, বাসযোগ্য শহর বিনির্মাণ হয় তাহলে শহরের প্রতিটি নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা, জীবন-স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব মেয়রদের। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মেয়রদের নয়। ভালো কথা। ফুটফুটে শিক্ষার্থী প্রীতি মারা গেলেন। মেয়র হিসেবে তাঁর কাছে যাওয়া, ওই পরিবারকে সহানুভূতি জানানো কি মেয়রের উচিত ছিল না? আমি ধন্যবাদ জানাই তথ্যমন্ত্রীকে অন্তত সেই মানবিকতাটুকু তিনি দেখিয়েছেন। সন্ত্রাস, ছিনতাই বন্ধ যেমন মেয়রের কাজ নয় তেমনি অন্যের জমিতে কী হচ্ছে তা দেখাও তো মেয়রের দায়িত্ব নয়। কিছুদিন আগে দেখলাম রেলের জমি নিয়ে এক মেয়রের নাটক। রেল কর্তৃপক্ষ এক জমি একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দিয়েছেন। সে জমিতে কাজ থামিয়ে মেয়র মহোদয় বীরত্ব দেখালেন। রেলমন্ত্রীকে টেলিফোনে রীতিমতো ধমক দিয়ে বোঝালেন তাঁর কী ক্ষমতা। অথচ এই রেলমন্ত্রী যখন ছাত্রলীগ করতেন তখন মেয়র কী করতেন তার খবর হয়তো তিনি নিজেই জানেন না। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা আসল আওয়ামী লীগকে যে পিষ্ট করছে এটি তার এক উদাহরণ। রেলমন্ত্রী আজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্য লড়াই করেছেন। আর গার্মেন্ট ব্যবসায়ী হঠাৎ আওয়ামী লীগার হয়ে মেয়র বনে গেছেন। মেয়রের ওই বীরত্ব দেখে আমার বেশ পুরনো হিন্দি ছবি ‘নায়ক’-এর অনিল কাপুরের কথা মনে পড়ল। আমাদের মেয়ররা যদি এভাবে সিনেমার মতো সব ঠিক করে দিতেন! আমাদের দুই মেয়রই অদ্ভুত। যখনই তাঁদের সমস্যার কথা বলবেন তখনই তাঁরা বলবেন, ‘এটা তো আমাদের ক্ষমতার মধ্যে না’। আবার জনগণকে নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁরা অবলীলায় জনগণকে জিম্মি করে ফেলেছেন। যেমন ইউলুপ। মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে যদি আপনি গুলশান বা বনানীতে যেতে চান তাহলে আপনাকে নৌবাহিনীর সদর দফতর পেরিয়ে আবার ঘুরতে হবে। বনানী থেকে যদি আপনি বিমানবন্দরে যেতে চান তাহলে আপনাকে মহাখালী গিয়ে ইউলুপ ধরতে হবে। মহাখালী থেকে বনানী পর্যন্ত তীব্র যানজটের প্রধান কারণ এসব ইউলুপ। জনসম্পৃক্তহীন, জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না এমন ব্যক্তিই এ রকম জনবিরোধী কাজ করতে পারেন। এখন আবার গাড়ি চলার জোড়-বিজোড় নাটক মহানগরীর মানুষের জন্য নতুন বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাদের দুই মেয়র মাশাল্লাহ ধনাঢ্য। তাঁদের জোড়-বিজোড় সব ধরনের গাড়িই আছে। কিন্তু ওই ব্যাংকারের মতো হাজারো মানুষের কী হবে? উবার চালকদের কী হবে?

 

মেয়ররা কীভাবে নগর পরিচালনায় সিদ্ধান্ত নেন তার একটা চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের কাছ থেকে। সম্প্রতি সাদিক খান পুলিশ ও অপরাধ প্রতিরোধবিষয়ক একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল সময়ে কীভাবে পুলিশকে আরও সংবেদনশীল করা হবে। কীভাবে লন্ডনে অপরাধ কমানো হবে তার একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা করা হয়েছে ওই কৌশলপত্রে। সাদিক খানের এ পরিকল্পনা স্বপ্নে পাওয়া তাবিজের মতো উদয় হয়নি। এ পরিকল্পনা প্রণয়নে সাদিক খান ৪ হাজার লন্ডনবাসীর মতামত নিয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। লন্ডনের মেয়রের কার্যক্রমের পরিধি অনেক বিস্তৃত। মেয়রের অধীনে ১০ জন ডেপুটি মেয়র রয়েছেন। যাঁরা ১০টি মূল বিষয় দেখাশোনা করেন। পরিবেশ, আবাসন, আইনশৃঙ্খলা, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, গণপরিবহন ইত্যাদি। নগরের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দায়িত্ব লন্ডন মেয়রের হাতে। সে তুলনায় ঢাকার দুই সিটি মেয়রের ক্ষমতা নিতান্তই দুধ-ভাত। এই ক্ষমতাহীনতার মধ্যে তাহলে তাঁরা স্বপ্নের ঢাকার গল্প শোনান কেন? কদিন আগে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণে শ্রেষ্ঠত্বের খেতাব পাওয়া দুই মেয়রকে এসব মাথায় রেখে কাজ করতে বললেন। কিন্তু অনুষ্ঠানেই দুই মেয়র অজুহাতের পাহাড় জমা করলেন। বললেন সমন্বয়হীনতার সেই পুরনো প্যাঁচাল। দুই মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকায় জলাবদ্ধতা নিয়ে কথা হলো। মেয়ররা অভিযোগ নিজের ঘাড় থেকে নামিয়ে ওয়াসার কাঁধে তুলে দিলেন। দুই মেয়র জানালেন জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ খাল ভরাট। খালগুলো ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খালগুলো দুই সিটি করপোরেশনে হস্তান্তরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই হস্তান্তরের আগেও একখণ্ড ‘খাল নাটক’ হয়ে গেল। মন্ত্রী ও মেয়ররা গেলেন খাল পরিদর্শনে। একটি খালের মর্মান্তিক মৃত্যু সরেজমিন প্রত্যক্ষ করলেন। আমরা ঢাকাবাসী আশায় বুক বাঁধলাম। এবার নিশ্চয়ই খাল উদ্ধার হবে। খালে নৌকা চলবে। ঢাকা শহরের কয়টা খাল উদ্ধার করেছেন মেয়ররা? আমাদের মেয়রদের ক্ষমতা নেই এ যেমন সত্যি, তার চেয়েও সত্যি ক্ষমতা পেলেও তাঁদের যোগ্যতার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। ঢাকা মহানগরীর প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। ১৯৯৮ সালে ঢাকার অন্তহীন সমস্যা নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। এ সাক্ষাৎকারের আগে থেকেই মোহাম্মদ হানিফ নগর সরকারের কথা বলে আসছিলেন। ওয়াসা, রাজউক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সিটি করপোরেশনের অধীন আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ হানিফ বিএনপির পতন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তিনি ‘জনতার মঞ্চ’ করার ক্ষেত্রে অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। বিপুল জনপ্রিয়তা, অসাধারণ বাগ্মিতার কারণে জনতার মঞ্চে মেয়র হানিফ ছিলেন অন্যতম আকর্ষণ। ১৯৯৪ সালে মেয়র হওয়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যে মেয়র হানিফের দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। হানিফ আশা করেছিলেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে হয়তো তাঁর নগর সরকারের দাবি মানা হবে। ওইদিন সাক্ষাৎকারে নগর সরকার না হওয়া নিয়ে হানিফ তাঁর হতাশার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তাঁর সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বয়হীনতার কথা। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পুরান ঢাকায় মেয়র হানিফ বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছিলেন। ঢাকা শহরকে ভুতুড়ে নগরী থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিয়েছিলেন। মেয়র হানিফের পর মেয়র হয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। খোকাও ঢাকার জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। ’৯৬-এর নির্বাচনে ঢাকা মহানগরী থেকে তিনিই একমাত্র বিএনপি প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা মহানগরীর মতো এত বিপুল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত শহরে তিনি ছিলেন খণ্ডকালীন মেয়র। একদিকে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী অন্যদিকে ঢাকা সিটির মেয়র। এ দুই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো দিকেই মনোযোগ দিতে পারেননি।

এই সময়ে খোকার ক্যাডাররা সিটি করপোরেশনকে লুটপাটের আখড়া বানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ আমলেও সাদেক হোসেন খোকা প্রায় দুই বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু মেয়র হিসেবে স্মরণীয় কিছু করতে পারেননি তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ঢাকাকে উন্নত ও গতিশীল করার জন্য একে দুই ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশে^র অনেক বড় শহরেই এভাবে সিটি করপোরেশনকে ভাগ করা হয়েছে কাজের সুবিধার জন্য। যেমন দিল্লির তিনটি সিটি করপোরেশন করা হয়েছে। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব। সে আলোকেই ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন করা হয়। সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর নির্বাচনও হয়। উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন মেয়র নির্বাচিত হন। উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে আনিসুল হক প্রথম নগরবাসীর চোখ খুলে দিয়েছিলেন। স্বল্পসময়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন ক্ষমতা কিছু নয় আসল হলো উদ্ভাবনী চেষ্টা আর দক্ষতা। জনগণকে সম্পৃক্ত করা। জনগণের কথা ভাবা। এককভাবে নয়, অংশীজনকে নিয়ে পরিকল্পনা করা। স্বল্পসময়ে আনিসুল হক ঢাকাকে বদলে ফেলার কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন। তিনিই ঢাকার একমাত্র মেয়র যিনি সমস্যার উৎসমূলে গিয়ে তার সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। তেজগাঁওয়ে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, গাবতলী বাসস্ট্যান্ড দখলমুক্ত করা, ‘ঢাকা চাকা’র মাধ্যমে তিনি ঢাকার যানজট নিরসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কিছু কিছু কাজ শেষ হলে অন্তত ঢাকা উত্তর পাল্টে যেত। যেমন কারওয়ান বাজার সরিয়ে নেওয়া, বৃক্ষায়ন ইত্যাদি। আনিসুল হক বলেননি এটা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে নয়। বরং তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্বের ব্যাপ্তি বাড়িয়েছিলেন। আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ঢাকা উত্তর নতুন মেয়র পায়। নতুন মেয়র বলেন, আনিসুল হকের অসমাপ্ত স্বপ্ন তিনি সমাপ্ত করবেন। করেছেন বটে। ‘ঢাকা চাকা’র ছোট সাইজের বাসের বদলে তিনি গুলশান-বনানীতে বিশাল সাইজের বাস নামিয়েছেন। এটাই এখন ওই এলাকায় যানজটের কারণ। দুই মেয়র এখন শব্দ আর বায়ু দূষণের মতোই আরেক নতুন অত্যাচার। এখন শব্দের অসহ্য অত্যাচার আর শ্বাস বন্ধ করা বায়ুদূষণের মধ্যে অসুস্থ আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, এ শহরে আসলে মেয়রের দরকার কী?

 

আরও পড়ুন