শুনানির অপেক্ষায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল

দেড় দশক আগের এই দিনটিতে ভয়াবহ গ্রেনেট হামলায় বোমার স্প্লিন্টারে কেউ হারিয়েছেন চোখ, কারো গেছে চলার ক্ষমতা, কেউ হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, আবার কারো সারাজীবনের সঙ্গী হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

পেপারবুক (মামলার রায়ের অনুলিপিসহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হলে এ বিষয়ে শুনানি শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পেপারবুক তৈরির কাজ প্রাথমিকভাবে শুরু হয়েছে।

শুনানির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, পেপারবুক প্রস্তুত হলেই ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি তাড়াতাড়ি শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন জানান, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের ক্রম অনুযায়ী এই মামলায় শুনানি হতে সময় লাগবে। তাই পেপারবুক প্রস্তুত হলেও দ্রুতই শুনানি শুরু হচ্ছে না।

আইনজীবীরা জানান, পেপারবুক প্রস্তুত হলে সেটি প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করা হবে। প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের এখতিয়ারসম্পন্ন একটি বেঞ্চে এর ওপর শুনানির জন্য পাঠাবেন। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিতে পারে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মহিলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ দলটির কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হন।

ঘটনার ১৪ বছরের বেশি সময় পর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরও ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় দেশীয় জঙ্গি সংগঠন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় এ হামলা করে।’

তবে ওই পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ‘রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীরূপে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস কাম্য নয়।’

এদিকে রায়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক দুই মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হুজির সাবেক আমির শেখ আবদুস সালাম, জঙ্গি আবদুল মাজেদ ভাটসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জঙ্গি ইয়াহিয়া, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিনসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী হয়েও অপরাধীদের রক্ষায় কাজ করায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা এ টি এম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসানসহ ১১ জনকে সর্বনিম্ন দুই বছর এবং সর্বোচ্চ তিন বছর করে কারাদণ্ড দেয় আদালত।

মামলায় ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জঙ্গি তাজউদ্দিন, মো. হানিফসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের সময় কারাগারে ছিলেন ৩১ আসামি। আর মামলা চলাকালে অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ, জঙ্গি শরীফ শাহেদুল বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে এই মামলা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়।

নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স সংক্রান্ত নথি গত বছরের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে পাঠানো হয়। রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডপ্রাপ্তরাও আপিল ও জেল আপিল করেন। তবে আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে পলাতক আসামিরা আপিলের সুযোগ পাননি। তারা গ্রেপ্তার হলে কিংবা আত্মসমর্পণ করলে আপিলের সুযোগ পাবেন। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ৪৪টি জেল আপিল গত ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্ট শুনানির জন্য গ্রহণ করে। ওই দিন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আপিলকারীদের অর্থদণ্ড স্থগিত করে।

আরও পড়ুন