সিডরের মতোই শক্তি নিয়ে ‘আম্পান’

ইকরামুল হক ইহান

প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে সুপার ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’। এটি আগামীকাল বুধবার খুব ভোর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে যে কোনো সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিঘা থেকে বাংলাদেশের নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ পর্যন্ত উপকূলজুড়েই আছড়ে পড়তে পারে। তবে এটির মূল চোখ দুই দেশের সুন্দরবনের ওপর দিয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা কম্পিউটারের মডেল বিশ্লেষণ করে ধারণা করছেন। এতে উভয় দেশই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেঁচে যাবে। ৫টি ক্যাটাগরির ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ‘সুপার ঘূর্ণিঝড়’ সর্বোচ্চ মাত্রার। এটি সবচেয়ে শক্তিসম্পন্ন ও ভয়াবহ।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ‘আম্পান’ ঘণ্টায় গড়ে ২২ কিলোমিটার বেগে এগোচ্ছে উপকূলের দিকে। শক্তি সঞ্চয় করে ‘সুপার সাইক্লোনে’ রূপ নিয়েছে এটি। প্রতিনিয়তই এর শক্তি বাড়ছে। তবে আবহাওয়াবিদরা জানান, বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানার সময় এর গতি কিছুটা কমে ‘এক্সট্রিম সিভিয়ার সাইক্লোন’ বা ‘অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ রূপ নিতে পারে। এর পরও ঘূর্ণিঝড়টি ২০০৭ সালের সিডরের মতোই শক্তি নিয়ে আসতে পারে।

সোমবার রাত ১টায় এ রিপোর্ট লেখাকালে আন্তর্জাতিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রগুলোর দেয়া তথ্যমতে, ঝড়টির কেন্দ্র থেকে ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ২৬৮ কিলোমিটার ছিল। যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়া আকারে ২৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে বাংলাদেশে আঘাতের সময় এর গতি সর্বোচ্চ ১৮০ থেকে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এটি রাত ১২টায় বাংলাদেশ উপকূল থেকে গড়ে সাড়ে ৯শ’ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। সিডরের গতি ছিল ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের মাঝখানে প্রবাহিত বলেশ্বর নদীর মুখ দিয়ে সুন্দরবন অতিক্রম করেছিল সিডর।

তবে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, ১৯ মে দিবাগত ভোররাত (২০ মে সকাল) থেকে পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে এটি বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। বর্তমানে বাতাসের গতি যেটাই থাকুক কেন, আঘাত হানারকালে এর গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

কেননা, ঘূর্ণিঝড় যতক্ষণ সাগরে থাকে তখন এর শক্তি সরবরাহ হয়। আর ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশ যখন উপকূলে পৌঁছায় তখন শক্তি সরবরাহ কমতে থাকে। ফলে তা দুর্বল হতে শুরু করে। ওই অবস্থায় ঝড়ের প্রকৃত শক্তি থাকে না।

সোমবার রাত ১২টায় ২১ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিএমডি বলেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ এবং চরসমূহ ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ এবং চরসমূহের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০-১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলায় এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০-১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

আর বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আম্পান ইতোমধ্যে ‘সুপার সাইক্লোনে’ পরিণত হয়েছে। এটি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যদিও বাংলাদেশে আঘাত হানার সময় শক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু তখনও এটি ‘এক্সট্রিম সিভিয়ার সাইক্লোন’ হিসেবে থাকতে পারে। এই ঝড়ের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অমাবস্যা। আগামী ২২ মে অমাবস্যা হতে পারে। এতে ঝড়ের সঙ্গে বাড়তি জলোচ্ছ্বাস (১২-১৩ ফুট) হতে পারে। গত ১৫ মে গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় সাগরে।

এর আগে এটি লঘুচাপ ও নিম্নচাপ পর্যায়ে ছিল। তখন পর্যন্ত এর গতিমুখ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যমুখী ছিল। ১৬ মে এটি সামান্য পূর্বদিকে বাঁক নেয়। তখন এটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশামুখী ছিল। পরে ১৭ মে রাত ৯টায় পূর্বদিকে বেশ বেঁকে যায় ঘূর্ণিঝড়টি। ১৮ মে সোমবার সকাল ৮টা নাগাদ আরেক দফা বাঁক নিয়েছে। ফলে এটি এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের দিকেই এগোচ্ছে বলে কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিএমডি বলেছে, পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুপার ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ উত্তরদিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি রাত ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ/দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ/দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ/দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ/দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

এটি আরও উত্তর দিকে সরে আসতে পারে এবং দিক পরিবর্তন করে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সুপার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া আকারে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুপার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাঝে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

এ কারণে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্ত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

তবে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) এবং জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার (জেটিডব্লিউসি) বলছে, দুপুর ১২টার দিকেই এটি ‘সুপার সাইক্লোন’ বা সর্বোচ্চ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। ওই সময়ে এর বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ছিল ২৫৯ কিলোমিটার।

পরে উভয় সংস্থার সন্ধ্যার বুলেটিনে বলা হয়, ঝড়টির বাতাসের গতিবেগ বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় ২৬৮ কিলোমিটার হয়েছে। এটি আরও শক্তিশালী ঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে। বুধবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের দিঘা এবং বাংলাদেশের হাতিয়া দিয়ে স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে এই ঝড়।

প্রসঙ্গত, ঘূর্ণিঝড়ের ৫টি ক্যাটাগরি আছে। পঞ্চম বা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটির নাম ‘সুপার সাইক্লোন’। বাতাসের গতি যখন ঘণ্টায় ২২১ কিলোমিটারের উপরে থাকে তখন সেটিকে সুপার সাইক্লোন বলে। রাত ১টায় আম্পানের বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬৮ কিলোমিটার। চার নম্বর ক্যাটাগরি হচ্ছে এক্সট্রিম সিভিয়ার সাইক্লোন।

এর বাতাসের গতি থাকে ১৬৬-২২০ কিলোমিটার। তৃতীয় পর্যায়েরটির নাম ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোন। এর বাতাসের গতি থাকে ১১৮-১৬৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নাম সিভিয়ার সাইক্লোন। এর বাতাসের গতি ৮৯-১১৭ কিলোমিটার। আর প্রথম ক্যাটাগরির ঘূণিঝড়ে বাতাসের গতি থাকে ৬৫-৮৮ কিলোমিটার।

বুয়েটের অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরের সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে, উপকূলের কাছাকাছি এলে এর শক্তি কিছুটা কমে যেতে পারে। কিন্তু তাও এর গতি ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন বা ১৯৯১ সালের সাইক্লোন কিংবা ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের মতোই শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়তে পারে।

তেমনটি হলে বাংলাদেশের ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। এই তিনটি ঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২০-২৪০ কিলোমিটারের মধ্যে। পাশাপাশি ১৫-৩৩ ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কম্পিউটারের মডেল আশা দেখাচ্ছে। হয়তো শেষপর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের সীমানায় সুন্দরবনের মধ্যে ঝড়টির মূল চোখ প্রবেশ করতে পারে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বেঁচে যাওয়ার আশা আছে। কিন্তু ঝড়টির চারদিকের বাতাসের গতি ও ঘূর্ণন অনেক ক্ষতি বয়ে আনবে।

বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য দুর্গতদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার। কেননা, এবারের পরিস্থিতি অন্যবারের মতো নয়। প্রথমত, রমজান মাস, দ্বিতীয়ত করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলছে। একদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ অন্যান্য সামগ্রী দিতে হবে। প্রায় ৬০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক থাকলেও তাদের কাজে লাগানো বড় চ্যালেঞ্জ।

পাশাপাশি আশ্রয় কেন্দ্রে যাদের নেয়া হবে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য এবার আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, আশ্রয় কেন্দ্রে যদি সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে মহামারী আরও ভয়ংকর রূপ লাভ করবে। ইতোমধ্যে করোনার প্রকোপ খুবই উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে। তবে দুর্গতদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া শুরু হবে মঙ্গলবার বিকাল থেকে। সন্ধ্যার মধ্যে সবাইকে স্থানান্তর নিশ্চিতের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে ওই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল বলেন, আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়টি এখন যে গতিতে এগিয়ে আসছে তাতে এটি বুধবার সকালের পর যে কোনো সময় বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তাই মঙ্গলবার বিকাল থেকে উপকূলীয় এলাকার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া শুরু হবে।

তিনি বলেন, এবার দুর্গতদের সামাজিক দূরত্ব মেনে আশ্রয় কেন্দ্রে ব্যবস্থা করতে হবে। গাদাগাদি করে যাতে না থাকে এ জন্য আমরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আশ্রয় কেন্দ্ররূপে ব্যবহার করছি। এ ছাড়া আরও ৫ হাজার সাইক্লোন শেল্টারও প্রস্তুত করা হয়েছে।

সারা দেশে প্রস্তুত ১২ হাজার আশ্রয় কেন্দ্র : ঘূর্ণিঝড় আম্পান উপকূলের দিকে ধেয়ে আসার প্রেক্ষাপটে ৫১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের জন্য ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। আজ সকাল থেকে মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। সোমবার সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে অনলাইন ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, করোনা সংক্রমণের সময়, তাই প্রত্যেকটি আশ্রয় কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বলেছি। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে আসবেন তাদের মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমাদের সিপিপি (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি) ভলান্টিয়ারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তারা যেন আগামীকাল সকাল থেকে সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কাজ করেন। এ কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কাজ করবে।

মঙ্গলবার রাতের মধ্যে সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হবে জানিয়ে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সোমবার দুপুর পর্যন্ত দুই হাজার ৫৬০ মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে গেছেন। কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নেবেন তাদের জন্য তিন হাজার ১০০ টন চাল, ৫০ লাখ নগদ টাকা, শিশু খাদ্য কিনতে ৩১ লাখ টাকা, গোখাদ্য কিনতে ২৮ লাখ টাকা এবং চার হাজার ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রস্তুতি : ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। ইতোমধ্যে, উপকূলীয় ১৩ জেলাসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটসমূহকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেছে সোসাইটির জাতীয় সদর দফতর।

এছাড়াও প্রস্তুত রাখা হয়েছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স টিম, ইউনিট ডিজাস্টার রেসপন্স টিমসহ সব কয়টি উপকূলীয় জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবকগণ ও ইউনিট কর্মকর্তাদের। ঘূর্ণিঝড় পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলের সাইক্লোন শেল্টারে সম্ভাব্য আশ্রয় নেয়া প্রায় ৩০ হাজার লোকের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি, সাইক্লোন শেল্টারে আসা লোকজন যেন সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ বিতরণসহ নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের ২২টি সাইক্লোন শেল্টারকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।

খুলনা ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’র সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে খুলনার ৩৬১টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫০ জনকে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আনার পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। ঝড়ের সার্বিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

এরই মধ্যে উপকূলবাসীকে সতর্ক করতে মাইকিং শুরু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জেলার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন উপজেলায় রেডক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ ২ হাজার ৪৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। এছাড়া বেসরকারি এনজিও’র উদ্যোগে রয়েছে আরও ১ হাজার ১০০ স্বেচ্ছাসেবক। এরই মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

মোংলা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর ও সুন্দরবন সংলগ্ন নদনদী উত্তাল থাকলেও স্বাভাবিক আবহাওয়া বিরাজ করছে মোংলাসহ সুন্দরবনসহ আশপাশ উপকূলীয় এলাকা জুড়ে।

যার ফলে মোংলা বন্দরে পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহনের কাজ চলছে স্বাভাবিকভাবে। মোংলা বন্দরে কয়লা ও ক্লিংকারবাহীসহ মোট ১১টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে এবং স্বাভাবিক পণ্য ওঠানামার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বন্দরের হারবার বিভাগ।

বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার ফখর উদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে জরুরি কন্ট্রোল রুম খুলেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিকালে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি হওয়ার পর বন্দরে অ্যালার্ট-৩ জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া পৃথক দুটি কন্টোল রুম খোলা হয়েছে বন্দরে। মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত মান্নান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায়, উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ১০৩টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, জেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানার আগেই দ্রুত ক্ষেতের ধান কেটে ঘরে নেয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। রোববার বিকালে জরুরি বৈঠকের পর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিকের নির্দেশে কৃষি বিভাগ মাইকিং শুরু করে। কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক হিরা লাল মধু জানান, এ বছর জেলায় ৩৮ হাজার ৭৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।

এ অঞ্চলের কৃষকরা একটু দেরিতে ধান কাটে। এ ছাড়া করোনা ভাইরাসের দুর্যোগকালীন সময়ে কৃষকরা ঘরে থাকায় অনেকে ধানকাটা শুরু করেনি। এ অবস্থায় সাগরে সৃষ্টি ঘূর্ণিঝড় আম্পান ধেয়ে আসার খবরে উৎকণ্ঠায় আছেন কৃষকরা। জেলায় ১ হাজার ১০৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে মনপুরা উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন কলাতলীরচর, ঢালচর ও চরশামসুদ্দিনের বাসিন্দারা রয়েছে চরম ঝুঁকির মধ্যে। ওই সব চরে প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করে। সেখানে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র নেই বলে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে চরে বসবাসরত বাসিন্দারা। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চরের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছেন জানিয়েছেন ইউএনও বিপুল চন্দ্র দাস। এছাড়া উপজেলার ৭৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, আমতলী-তালতলী উপকূলের সাগর ও পায়রা নদী সংলগ্ন অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলের মানুষকে রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখতে খোলা রাখা হয়েছে দুই উপজেলার একশ’ ২৮টি সাইক্লোন শেল্টার। সাগর ও নদীতে মাছ ধরা ট্রলার, নৌকা ও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যেতে সোমবার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে।

আরও পড়ুন