স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের বৈঠক আজ

জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা চান। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর এবং শক্তিশালী করতে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল জেলা পরিষদ। একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের পাঁচ জন নারী সদস্য নিয়ে গঠিত জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, তাদের কাজ কী হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই। কোন কোন কাজ তদারকি করতে পারবেন, বা করা উচিৎ, তাও বলা নেই।

 

এ অবস্থায় বিষয়টি সুরাহা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে আজ রবিবার (২৮ জুলাই) বৈঠকে বসছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা। কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মিলনায়তনে সকাল সাড়ে ১০ টায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

এখানে পদমর্যাদা-কর্মপরিধির বিষয়ে কোনও সুরাহা না হলে প্রয়োজনে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানিয়েছেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা প্রাথমিকভাবে দশ দফা দাবি তুলে ধরবেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও তারা স্থানীয় উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। এর মূল কারণ তাদের পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়টি আইনে স্পষ্ট না থাকা।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, ‘কাজ কী হবে-না হবে, তা না জেনেই নির্বাচনে নেমেছিলাম। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করতে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। আমাদের পদমর্যাদাটাও ঠিক করে দেওয়া উচিৎ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সুরাহার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে রবিবার বৈঠকে বসবো, প্রয়োজনে আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীরও দ্বারস্ত হবো’।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাজের পরিধি নির্ধারণ করে না দিলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাজ কী হবে? তারা কী ভূমিকা পালন করবেন তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি আছে। আইনে কোনোটাই পরিস্কার করা হয়নি। আইনে তাদের ১২টি ফাংশন আছে। একটা ফাংশন হচ্ছে- জেলা পর্যায়ে সকল উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা। এটা যদি করতে হয়, ডিসির নেতৃত্বে যে উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি আছে, সেই ফাংশনটা চেয়ারম্যানের কাছে চলে আসে। তাহলে এটা আদৌ কী হচ্ছে, সেটা দেখতে হবে।’

১৭৭২ সালে জেলা প্রশাসন সৃষ্টির ১১০ বছর পর ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের ঐতিহাসিক রেজুল্যুশনের মাধ্যমে তিন স্তরের গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনে স্থানীয় ‘জেলা বোর্ড’ শক্তিশালী প্রশাসনিক ভিত্তির ওপর দাড়ায়, যা পাকিস্তানের প্রথম দশক পর্যন্ত বজায় ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেলা পরিষদের অবকাঠামো, জনবল, সম্পদ ও জাতীয় বাজেটে নিয়মিত বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি আড়ালে পড়ে। ১৯৭৫ সালে জেলায় ‘গভর্নর’ নিয়োগ করে জেলা প্রশাসকসহ জেলার সামগ্রিক প্রশাসনকে তার অধীন করে একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা হয়। পরে বিএনপির শাসনামলে ‘জেলা উন্নয়ন সমন্বয়ক’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে প্রতিটি জেলায় রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে ওই পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৯৮৮ সালে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় প্রণীত স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নিয়োগ দেয়া হয়; যা ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পযন্ত বলবৎ ছিল। পরে বিএনপি সরকার জেলা প্রশাসদের (ডিসি) এই দায়িত্বে রাখে। ২০০০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠনের জন্য নতুন আইন করে।

২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকার ৬১ জেলায় আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও আদালতের আদেশে কুষ্টিয়া ও বগুড়ায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন আটকে যায়। বিএনপির বর্জনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত ২১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ভোটের আগেই। ভোটের দিন আওয়ামী লীগ ও তাদের বিদ্রোহীরা জেতেন ৩৮ জেলায়। এটিই ছিল জেলা পরিষদের ১৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম সরাসরি নির্বাচন।

নির্বাচনের পর ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানরা শপথ নেন। ওই অনুষ্ঠানে মানুষের সেবা ও উন্নয়নে জেলা পরিষদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সরকারের উন্নয়নকাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে নবনির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

চেয়ারম্যানদের উদ্দেশে তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের দায়িত্ব হবে প্রতিটি উন্নয়নকাজ যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা এবং নিজ নিজ জেলার সার্বিক উন্নয়ন এবং সমস্যা খুঁজে বের করা। কী করলে সেই জেলার আরও উন্নতি হতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া’।

আরও পড়ুন