সাহসীদের বীরত্ব গাথা

advertisement

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জঙ্গির হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় করা হামলায় কেউ কেউ জীবন বাঁজি রেখে হামলাকারীকে ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের সেই বীরত্বগাথার গল্প ক্রমেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। এদের মধ্যে দুইজনের নাম বেশি আলোচনায় এসেছে। তারা হলেন আব্দুল আজিজ এবং নাইম রশিদ। এদিকে গত তিন দিন ধরে হতাহতদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। হতাহতদের সহায়তায় ৬৩ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। ব্রেটন টারান্ডের কান্ডে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। খবর বিবিসি, ডেইলি মেইল, রয়টার্স ও ডয়চেভেলের

বীরদের কথা

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন জানিয়েছেন, হামলাকারী গাড়ি থেকে রাখা অস্ত্র নিয়ে আরো হামলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু কিভাবে ঠেকানো গেল সেই হামলা? এর জবাব পাওয়া গেছে সাহসী বীরদের গল্প থেকে। এদের একজন ৪৮ বছর বয়সী আব্দুল আজিজ। আফগানিস্তান থেকে কয়েক বছর আগে নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন তিনি। তিনি লিনউড মসজিদের ভেতর ছিলেন। গুলির শব্দ শুনে বুঝতে পারলেন মসজিদে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি ক্রেডিট কার্ডের মেশিনটি তুলে নিয়ে জঙ্গি টারান্টের দিকে তাক করলেন। টারান্ট আরো অস্ত্র আনতে গাড়ির দিকে দৌঁড় দিল। আজিজও দৌঁড় দিলেন। টারান্ট গাড়ির কাছে গিয়ে অস্ত্র দিয়ে গুলি করার চেষ্টা করলো। আজিজ দুই গাড়ির মাঝে শুয়ে পড়লেন। এরপর হামলাকারীর একটি অস্ত্র কুড়িয়ে নিলেন। কিন্তু তাতে বুলেট ছিল না। তারপরও সেটা দিয়ে হামলাকারীকে তাড়া করলেন। টারান্ট গাড়িতে ঢুকে গেলেন। লিনউড মসজিদের ইমামও জানিয়েছেন, আজিজের কারণে অনেক মানুষ বেঁচে গেছেন।

নাইম রশিদ

অতি জাতীয়তাবাদী শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি টারান্ট প্রথমে হামলা করেছিলেন আল নূর মসজিদে। ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই সময় প্রথমে তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন নাইম রশিদ। তিনি পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের বাসিন্দা। কিন্তু চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি। তাকে গুলি করে জঙ্গি টারান্ট। পরে হাসপাতালে তিনি মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানিয়েছেন, নাইম রশিদের সাহসিকতায় অনেক মানুষ বেঁচে গেছেন। না হলে মুসল্লিরা পালানোর সুযোগ পেতেন না। রশিদের ২১ বছর বয়সী ছেলে প্রকৌশলী তালহাও মারা গেছে যে নতুন একটি চাকরি পেয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নাইম রশিদকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাকে বীর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

জুলফিরম্যান সিয়াহ

দুই বছরের সন্তান অ্যাভেররোসকে নিয়ে লিনউড মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন জুলফিরম্যান সিয়াহ। টারান্ট হামলা শুরু করলে ছেলেকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। এরপর ছেলেকে পেছনে রেখে নিজেই বন্দুকের সামনে দাঁড়ান। নিজের বুকে বুলেট বিদ্ধ হলেও সন্তানের শরীরে লাগতে দেননি। জুলফিরমান এবং তার সন্তান হাসপাতালে। জুলফিরম্যানের অপারেশন করা লাগবে। তবে সন্তান সুস্থ হয়ে উঠছে।

শোক এবং স্মরণ

নিউজিল্যান্ডে চলছে শোকের মাতম। গতকাল রবিবারও ক্রাইস্টচার্চে মানুষের ভিড় ছিল। সবাই এসেছিলেন নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে। সবার হাতেই ছিল ফুল এবং শোক জানিয়ে লেখা নোট। স্থানীয় মাওরিরাও এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। তারা নেচে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

নিহতের সংখ্যা বেড়েছে

দুই মসজিদে অস্ত্রধারীর জঙ্গি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে নিহতের স্বজনদের খবর জানানো হয়েছে। গতকাল সকালে নিউজিল্যান্ডের পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবারের হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪৯ থেকে ৫০ হয়েছে। কিউই পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আল-নূর মসজিদে লাশগুলো সরিয়ে নেবার সময় বাড়তি লাশটি পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এখানে ৪২টি লাশ পাওয়া গেছে। লিনউড মসজিদে আরো সাতজন এবং ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালে নেয়ার পর একজনের মারা যান। এখনো ৩৪ জন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন যাদের মধ্যে ১২ জনের অবস্থা আশংকাজনক। এদের মধ্যে ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশু আছে। কর্তৃপক্ষ নিহতের তালিকা প্রস্তুত করলেও জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি। ক্রাইস্টচার্চের মেয়র লিয়ানে ডালজিয়েল বলেছেন, দাফনের জন্য জায়গা প্রস্তুত করা হয়েছে যেন দ্রুততম সময়ে লাশ কবর দেয়া যায়।

পুলিশ কমিশনার বুশ বলেন, টারান্ট একাই গুলি করেছে। আরো দু’জনকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হলেও তারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়নি। একজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হবে। টারান্ট ২০ দিনের রিমান্ডে। তার সঙ্গে ব্রিটেনের চরমপন্থিদের যোগাযোগ আছে বলে জানা গেছে। তবে তার নানী মারি ফিতজগেরাল্ড অস্ট্রেলিয়ার একটি চ্যানেলকে বলেছেন, তারা এই হত্যাকান্ডে হতবাক হয়েছেন যে টারান্ট এমন একটি নৃশংস কান্ড ঘটাতে পারে। তারা কী দিয়ে নিন্দা জানাবেন তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।

নিউজিল্যান্ডে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যেন অটুট থাকে তা নিশ্চিত করবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা। তিনি আরো বলেন, সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অস্ত্র আইনে পরিবর্তন আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। টারান্ট নিজের নামে পাঁচটি বন্দুক কিনে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছে। নিউজিল্যান্ডের আড়াই লাখ মানুষের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স আছে এবং সামরিক ধরনের সেমি অটোমেটিক বন্দুকগুলোই কেবল নিবন্ধন করতে হয়। বিশ্লেষকরা বলেন, নিউজিল্যান্ডে প্রায় ১৫ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র মানুষের কাছে। তবে সেগুলো ঠিক কোথায়, কার কাছে, তার তথ্য নেই।

You might also like

advertisement