সিনেমাহল টিকে আছে ১৭৪ টি

advertisement

চরম ক্রান্তিকাল পার করছে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শিল্প। ক্রমশ: নিভে যাচ্ছে দেশের সিনেমা হলগুলোর রূপালী পর্দার আলো। গত দুই দশকে বন্ধ হয়ে গেছে দেড় হাজারের বেশী প্রেক্ষাগৃহ। অন্তত: ২৮ টি জেলায় এখন সিনেমা হল নেই একটিও। সারাদেশে ঢিমেতালে টিকে আছে ১৭৪ টি হল। এর মধ্যে নিয়মিত ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে ১১০ টিতে। এখন কেবল হল ভাঙার প্রতিযোগিতা চলছে।

সিনেমা হল ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে মাল্টিকমপ্লেক্স, গুদাম, গ্যারেজ, শপিংমল, গার্মেন্ট কারখানা বা বেসরকারি হাসপাতাল। মানহীন সিনেমা, অনুন্নত পরিবেশ, হল আধুনিকায়ন না হওয়া, হাতের মুঠোয় ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্সে সিনেমা দেখার অপার সুযোগ ইত্যাদি কারণে সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দর্শকরা। ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহসমূহের ক্রমবিলুপ্তির এই কালে আশা জাগিয়েও গণমানুষের কাছাকাছি যেতে পারছে না হাল ফ্যাশনের সিনেপ্লেক্সগুলো। পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছেন এর মালিকরা। এই পরিস্থিতির মধ্যে সুনির্দিষ্ট সিনেমা হলগুলোকে বাঁচানো, দেশের ছবির নির্মান বাড়ানো এবং ভারতসহ উপমহাদেশের ছবি আমদানির বাঁধাগুলো অপসারণের দাবিতে আগামী ১২ এপ্রিল থেকে সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতারা। তারা বলছেন, যে হলগুলো টিকে আছে তা লোকসান গুনে চালাতে হচ্ছে। ছবি চালিয়ে মাস শেষে বিদ্যুত্ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ নানা মেইনটেন্যান্স খরচ তোলা যাচ্ছে না। গত ১০ বছরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৯০ শতাংশ কর্মী পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। বছরে ছবি নির্মাণের সংখ্যা ৩৫-৪০ টিতে এসে ঠেকেছে।

তাই গত ১৩ মার্চ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার নওশাদ বলেন, লোকসান গুনতে গুনতে আমাদের পীঠ দেয়ালে ঠেকেছে। সিনেমা হল টিকিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত সিনেমা নেই। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে গুনতে হলের মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সেজন্য ১২ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব সিনেমা হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। রাজধানীর ’মধুমিতা’র অন্যতম কর্ণধার ইফতেখার নওশাদ বলেন, দীর্ঘদিন লোকসান গুনে সিনেমা হলটি চালাচ্ছি। মাস শেষে বিদ্যুত্ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ নানা মেইনটেন্যান্স খরচ রয়েছে। আমাদের পক্ষে লোকসানি এই প্রতিষ্ঠানটি আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গত রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া একটি সুপার হিট ছবি সমপ্রতি আবার মধুমিতায় প্রদর্শন করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রথম শোতে টিকিট বিক্রি হয় মাত্র ৯০০ টাকার মতো।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রবীন নেতা মিঁয়া আলাউদ্দিন বলেন, ব্যবসায়িক মন্দার কারণেই একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন যে সিনেমাগুলো নির্মিত হচ্ছে সেগুলো দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারছে না। চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে হলে বছরে অন্তত ২০টি ব্যবসা সফল সিনেমা থাকতে হয়। আমাদের দেশে বছরে ৪০-৪৫টি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে; কিন্তু সেগুলো দর্শক টানতে পারছে না। এ ধরনের সিনেমা দিয়ে মিলনায়তন পূর্ণ করা যায় না। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির অন্যতম নেতা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গত দুই দশকে দেশের কোথাও নতুন কোনো সিনেমা হল হয়নি যেগুলো আছে সেগুলো চলছে ধুঁকে ধুঁকে।

একাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজকের সাথে আলাপকালে তারা বলেছেন, প্রযোজকরা চাইলেই পরিচালককে দিয়ে ‘হিট ছবি’ নির্মাণ করিয়ে নিতে পারেন না। আসলে কারো কাছেই সিনেমা হিট করানোর কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। দর্শকদের হলে ফেরানোর জন্য কোন ফর্মুলা কাজে আসছে না। হল ভাঙাও ঠেকানো যাচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে কেউ নতুন করে সিনেমা প্রদর্শন ব্যবসায়ও আসছেন না।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে মূলত শুরু হয় সিনেমা হলের মন্দার দিন। স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট আর পাইরেসি গ্রাস করে দর্শকদের। ভারতের ছবির হুবহু নকল, অশ্লীল আর মানহীন গল্প নির্মাণ দর্শকদের ক্রমাগত হল বিমুখ করতে থাকে। এক সময় সিনেমা হল ভাঙলে দর্শকদের ভিড় যেন মিছিলের রূপ পেত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ঢাকায় নির্মিত ‘পিকচার হাউজ’ বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষাগৃহ, পরে যার নাম হয় ‘শাবিস্তান’। কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে হলটি। ১৯৬৪ সালে পোস্তগোলায় নির্মিত হয় তখনকার বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ সিনেমা হল ‘ডায়না’, যার আসন সংখ্যা ছিল ১২শ। কয়েক বছর আগে ডায়নারও ‘মৃত্যু’ হয়েছে। ডায়নার পাশেই ছিল যমুনা। সেই যমুনা হল ২০১৩ সালে বন্ধ করে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে হাসপাতাল। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গুলিস্তান হল ভেঙে গড়ে উঠেছে গুলিস্তান মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা সিনেমা হল ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেট। ঢাকা সেনানিবাসের গ্যারিসন বন্ধ হয়েছে ২০১৩ সালে, ২০১২ সালে বন্ধ হয়েছে পর্বত, সঙ্গীতা ও ঢাকা সেনানিবাসের সাগরিকা। গত এক দশকেই বন্ধ হয়েছে রূপমহল, লায়ন, স্টার, বিউটি, নাজ ও অতিথি। নিভে গেছে তাজমহল, জ্যোতি ও মুন সিনেমা হলের রূপালী পর্দাও। ভাঙার পথে রয়েছে মানসী।একপাশে মার্কেট হচ্ছে। মধুমিতা, জোনাকী, পদ্মা ও সুরমাও ভাল নেই। এই অবস্থা কেবল রাজধানী, বিভাগীয় , জেলা শহরেই নয়, মফস্বলে তো হলই নেই।

বিন্দু হলের মালিক সুমন বলেন, দর্শকের অভাবে হলটি বন্ধ করতে হয়েছে। তাই এটিকে বর্তমানে গুদাম বানিয়ে ব্যবসা করছি। সূচনা হলের মালিক রমজান আলী বলেন, দিন দিন দর্শক কমতে থাকায় ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। বর্তমানে হলটিকে গুদাম বানিয়ে স্টক ব্যবসা করছি। চলচ্চিত্র বোদ্ধারা বলছেন, হল ব্যবসায়ে ধসের এই প্রেক্ষাপটে চলতি শতকের শুরুতে ’মাল্টিপ্লেক্স মুভি থিয়েটার’-এর ধারণা বাংলাদেশের সিনেমার বাঁচার আশা জাগালেও সেই পথ বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। বসুন্ধরা শপিং মলে ২০০৪ সালে চালু হওয়া ’স্টার সিনেপ্লেক্স’ এখন রাজধানীর একশ্রেণীর তরুণদের অন্যতম পছন্দের বিনোদন কেন্দ । চালু হয়েছে যমুনা ফিউচার পার্কে ‘ব্লক বাস্টার’। এছাড়া পুরনো ‘শ্যামলী’ হল ভেঙে ‘শ্যামলী স্কয়ার’ শপিংমলের অংশ হিসেবে চালু হয়েছে ‘শ্যামলী সিনেমা’। গত ২৬ জানুয়ারী ধানমন্ডির সীমান্ত সম্ভারে চালু হয়েছে স্টার সিনেপ্লেক্সের নতুন শাখা। আধুনিক এসব মুভি থিয়েটারে দর্শকদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা থাকলেও যা দেখানো হয় তার বেশিরভাগই সরাসরি আমদানি করা বিদেশি সিনেমা। নির্দিষ্ট দর্শক শ্রেণির জন্য উচ্চ মূল্যের টিকিটের এসব মুভি থিয়েটারকে ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহের উত্তর প্রতিনিধি মানতে রাজি নন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই। মূলত ঢাকায় মাল্টিপ্লেক্স যে হলগুলো চলছে সেগুলো মার্কেটের সঙ্গে বিনোদন ব্যবস্থার অংশ। ঢাকার মাল্টিপ্লেক্স প্রেক্ষাগৃহগুলোতে টিকিটের দাম ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। আর পুরনো সিনেমা হলগুলোতে টিকিটের দাম ড্রেস সার্কেল ১০০ থেকে ১৮০ টাকা, রিয়ার স্টল ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং স্টল ২৫ থেকে ৪০ টাকা।

কুমিল্লার চান্দিনা হলের প্রদর্শক মো. আলমগীর বললেন, হলের ব্যবসা পুরোটাই লস। আমার হলে বর্তমানে ’বউ বাজার’ নামে একটি ছবি চালাচ্ছি। গতকাল সারাদিনে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৩০০ টাকা আর খরচ ৬ হাজার টাকা। কিন্তু তারপরও চালাচ্ছি। কারন হলের মালিক চাচ্ছেন এটি চালু থাকুক।

প্রদর্শক নেতা মিয়া আলাউদ্দিন মনে করেন, হল বন্ধের কারনে শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসারই বিলুপ্তি ঘটছে না, বিনোদনের অভাবে মফস্বল শহরগুলোয় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। শ্রমজীবী মানুষ দিনভর খাটুনির পর সন্ধ্যায় বিনোদনের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করতে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখত। একসময় তারা মনের মতো ছবির অভাবে সিনেমা হলবিমুখ হয়। হাতে গোনা কয়েকজন গেলেও এখন প্রায় জায়গায় সিনেমা হল না থাকায় বিনোদন হিসেবে তারা সিডি-ডিভিডিতে সেন্সরবিহীন আপত্তিকর দৃশ্যের সিনেমা ও নীল ছবি দেখে এবং জুয়া, হাউজি, মাদকদ্রব্যের আশ্রয় নিয়ে সমাজে অপরাধ বাড়াচ্ছে। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ৬৪ জেলায় সিনেপ্লেক্স দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতির অংশ চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মঞ্চ ও বেতার। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের চলচ্চিত্র খুব দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরিয়ে আনতে অতিসত্বর ৬৪ জেলায় সিনেমা হলগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ আরো সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করতে হবে।

You might also like

advertisement