পরিবারের দূরত্ব-যুবসমাজ ও অবক্ষয় প্রতিবেদক বৃত্তের বাহিরে।

এম. এ জলিল রানা

advertisement

পরিবারের দূরত্বেই বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। আমরা যদি মাত্র ৮০ দশক বা ৯০ দশকে ফিরে দেখি সে সময় মা,খালা,চাচিরা বেশির ভাগই ছিল ঘরমুখ। বাবারা সংসারের চাহিদা মেটাতে হাল কৃষি ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকুরী নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কর্তার উপার্জিত অর্থ সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়ে সংসারকে সার্বিকভাবে শামাল দিতে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝে দিনাতিপাত করতেন মায়েরা।

চিরাচরিত নিয়মে পরিবারের রক্তের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন ধরে রাখতে সন্তানকে সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পিতৃ ও মাত্রি তান্ত্রিক আদী অটুট এ বন্ধন সুরক্ষিত রাখাতে মায়েদের ভূমিকা সর্বকালে সর্বযুগে অগ্রগণ্য। বর্তমানেও এ গুরুত্বের বিকল্প নাই। একটি সন্তানকে দীর্ঘদিন গর্ভে ধারন করে সীমাহীন দুঃখ কষ্ট সহ্য করে পৃথিবীর আলো দেখান মায়েরা।

তাই পৃথিবীর সকল মায়েদের দায়িত্ব বাবাদের তুলনায় অনেকটায় বেশি। বাবা মায়েরা কম শিক্ষিত বেশি শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যাই হোক না কেন সন্তানের ভালমন্দ প্রতিটি বাবা মায়েরা বুঝে থাকেন সে ক্ষেত্রে সন্তানের চাওয়া- পাওয়া-আশা-আকাঙ্খা পুরনের অগ্রনী ভূমিকায় থাকেন মায়েরা। সে সময় গ্রামগঞ্জের মানুষেরা ডিজিটাল কি জানতো না, ঘড়ে ঘড়ে বৈদ্যুতিক আলো ছিল না, ছিল না টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট, ফেসবুক টুইটার, ইমু ওয়াটসআপ, ম্যাঞ্জোর ইউটুব এবং ভিডিও কলের এতো ব্যবহার। ওইসব প্রত্যন্তঞ্চলে কোথাও আধুনিকতার ছোঁয়াও চোখে পড়েনি। তখনকার গ্রামীন জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল খুবই নাজুক। ৮/১০ এবং ১২ জন সদস্যের কমে কোন পরিবার ছিল না বললেই চলে। একেকটি পরিবারে একাধিক শিক্ষার্থী ছিল। অস্বচ্ছল ও দৈন্যতার চাপ থাকলেও মনবল ছিল সু-দৃঢ়। এবং পরিবার পরিচালনার নিয়ম বা পদ্ধতি ছিল সাদামাটা। কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিলো বেশি।

তাইতো কেরোসিন পুরিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় গোলাকার হয়ে পড়ালেখা করতো একসাথে সবাই। দিনভর কঠোর পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত দেহ একটুখানি জুড়িয়ে নিতে সংসার কর্তা ব্যক্তিরা কর্ম রেখে অবসরে গেলেও সংসার কর্তীরা সারাদিন হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটে অনাহারে অর্ধাহারে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সংসার সন্তান পরিবার পরিজনদের সার্বিক দেখভাল নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন তারা। এভাবেই জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সংসার নামের মহাজজ্ঞকে যক্ষের ধনের ন্যায় আগলে রাখতেন সে সময়ের মায়েরা। তারা প্রমান করেছে নারীদের দায়িত্ব এবং অংশ গ্রহন ব্যতীত পরিবার অসম্পূর্ণ।

পরিবারের সদস্য বা সন্তানরা যতদিন পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে সদস্যরা ততদিন পর্যন্ত মা-বাবার উপর বা পরিবার নির্ভরশীল হয়ে বেরে উঠে। ততক্ষন পর্যন্ত নাড়ীর টানে তারা বার বার ফিরে আসে পরিবারের কাছে। সন্তানদের উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মুখ্য সময়ই হলো ওই সময়। কারন প্রতিটি সন্তানের আদর্শ ও ভবিষ্যৎ বুনিয়াদী শিক্ষা মায়ের হাতে। দুঃখ জনক হলেও সত্য ডিজিটাল বাংলাদেশের সব কিছুতে বিশ্বায়নের হাওয়া যেখানে তাকায় আধুনিকতার ছোয়া দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরাও বদলে গেছি। যা করি সব আধুনিক। যা পড়ি তাই এখন মডার্ণ ফ্যাশন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সঠিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নারীদের সংসারে কোন দায়িত্ব পালন করতে বললেই তারা মনে করে সমাজটা এখনো পুরুষতান্ত্রিক তাই পুরুষরা তাদের অর্ডার করছে। ফলে এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। সারা বিশ্বে নারী অধিকার নিয়ে ঝড় বইছে।

নারীরা চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। সবখানে নারীদের অংশ গ্রহণ নেয়। নারীরা সবকিছু থেকে বঞ্চিত এই অভিযোগ গুলো তুলেধরে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক শ্রেণীর নারী পুরুষরা মিছিল, মিটিং, সভাযাত্রা ও মানববদ্ধন ইত্যাদি কর্মসূচী নিয়ে প্রতিনিয়ত রাজপথ মূখরিত করে তুলছে। আসলে কি তাই? নাকি অন্য কিছু। সমাজসেবা, রাজনীতি, জনপ্রতিনিধি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং চলমান
চাকুরীর ক্ষেত্রে পিয়ন থেকে সচিব পর্যন্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে সবখানে নারীদের সমঅধিকার রয়েছে। এর পরেও বলা হয় নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। সবখানে নারীর অংশগ্রহন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে চলমান অবস্থায় সংসদ থেকে শুরু করে মেঠোপথ পর্যন্ত যেমন রাজনীতি সমাজনীতি, অর্থনীতি ধর্মনীতি আইন ও বিচার এমনকি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনসহ সকল আচার অনুষ্ঠান ও দিবস এলেই তারা বলে থাকেন নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে নারী এবং পুরুষ যে আলাদা কিছু নয় বরং নারী পুরুষ একে অপরের পরিপুরক এটা তারা মানতে নারাজ। পুরুষ ব্যতিত নারী পরিপূর্ণ নয় আবার নারী ব্যতিত পুরুষের জীবন অসম্পন্ন মূলত নারী এবং পুরুষ ব্যাতিত সংসার, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র স্থাবীর ও গতিহীন। সম্প্রতি নারী অধিকার ও নারী স্বাধীনতার যে আন্দোলন দেশে বিরাজমান তা নারীর প্রকৃত অবস্থান ধরে রাখতে তো পারেনি বরং নারী ও পুরুষের মাঝে বিভেদের বিশাল দেয়াল নির্মাণ করেছে।

যারা দিনে নারী আন্দোলনে ব্যস্ত থাকে, যাদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণিত হয় প্রায় প্রতিজন পুরুষরায় নারী বিদ্দেশী। অথচ সন্ধ্যার পর কোনো না কোনো পুুরুষের ঘরে ফিরতে হয় তাদের। পাশা-পাশি তারা প্রত্যেককে নিজের পরিবার সম্পর্কে বে-খেয়াল। ফিরে দেখা প্রয়োজন পৃথিবীতে যত নবী রাসূল-ওলী আওলীয়া-পীর মাশায়েখ-মহা-মণিষী বিজ্ঞানী রাজনীতিবিদ, সমাজসেবকসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন্ম নারীদের গর্ভে সুতরাং সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে এবং সংগত কারণে সংসার পরিচালনা সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরীর ক্ষেত্রে তাই নারীদের ভূমিকা অগ্রগর্ণ যা কোনো পুরুষরাই পারে না।

পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান ভাবে শিক্ষা, কর্ম, চাকরী রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে তাদেও সমাধিকার থাকবে কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছন্নতা নয়। আজ বেশিরভাগ পরিবারেই নারী পুরুষ উভয় কোনো না কোনো কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত সেক্ষেত্রে যে যার অবস্থানে অনড় ফলে পিতা-মাতা উভয়ে চাকরী ব্যবসা সমাজসেবা নয়তো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। নিজেরা সমাজ সংস্কার ও অধিকার নিয়ে ব্যস্ত সন্তান মানুষ হয় অন্যের হাতে (কাজের মানুষ) ফলে যা হয় সন্তানরা কখন কোথায় যায় কি করে তারা বে-মালুম। সর্বপরি মনে রাখা প্রয়োজন প্রতিটি সন্তান বেরে ওঠা ও শিক্ষার হাতে খড়ি মায়েদের হাতে (পরিবার) সন্তান যদি সু-শিক্ষায় শিক্ষিত না হয় তবে সে সু-নাগরিক হবে না।

একজন সু-নাগরিকই আর্দশ মানুষ, একজন আদর্শ মানুষই প্রকৃত মানুষ আর প্রকৃত মানুষই ভালো মানুষ হিসেবে বিবেচিত। ফলে একজন ভালো মানুষ দেশ জাতির কল্যাণে যেখানে যে, কর্মক্ষেত্রেই অবস্থান করুক না কেন দেশ জাতি তার কাছে পবিত্র আমানত যা কখনই খেয়ানত হবার নয়। তাই দেশে উন্নয়ন ও অগ্রগতি তরান্বিত করতে হলে নারীর সমঅংশগ্রহণ জরুরী। কিন্তু পরিবার উন্নত না হলে সমাজ বিধ্বস্ত হবে। দেশে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ হবে সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন । নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত কেবল এভাবে সম্ভব নারী পুরুষ বিভেদ নাই সবার জন্য সমাধিকার চাই।

আন্দোলন করে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত নয় বরং যোগ্যতার ভিক্তিতে নারী-পুরুষ উভয় সবখানে সমান ভাবে গ্রহণীয়। ফিরে আসি অন্য কথায়- পরিবারের দুরুত্বের কারণে নানা ভাবে যুব-সমাজ আজ দারপ্রান্তে। সংসারের কর্তা বা মা-বাবা সংসারের চাহিদা মেটাতে চাকুরী, ব্যবসা, কৃষিসহ নানামুখি কর্মের সাথে জড়িত থাকেন্ধসঢ়;। ফলে সংগত কারণে তারা বাহিরের তুলনায় ভেতরে ততটা সময় দিতে পারেন না। সে কারণে সংসারে মায়েদের ধকল পোহাতে হয় অনেকটাই বেশি। পুরুষের পাশা-পাশি নারীরাও কর্মমুখি অনেক আগে থেকেই সম্প্রতি সময়ের সংসার জীবনে বাড়ির বাহিরে এক শ্রেণীর নারী-পুরুষের বিরাট পাল্লা-পাল্লী চলছে। নারী-পুরুষ-ই চাকুরী, ব্যবসা, রাজনীতি, সমাজ সেবা, ক্লাব পার্টি, নাচে গানে সকাল থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাতভর মেতে উঠেছে সমানে সমান।

ফলে যা হয়েছে নিজ পরিবারে সময় দিতে পারছেন না কেউ-ই। যে কারণে ঐসব পরিবারের একজন নবজাতক শিশু জন্মের পর থেকে মোটামুটি কিশোর বয়স পর্যন্ত ঐ শিশু গুলোর আদর যত্ম, খানা-দানা, চলা-বলা শিক্ষা সংস্কৃতি এমনটি রাতে ঘুমানো পর্যন্ত বাড়ির কাজের লোক বা বুয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই শিশুরা শিশু বয়স পার হয়ে একজন শিশু যখন কিশোর বয়সে পা রাখে তখন তার মন মেজাজ, মানসিকতা, দেমাঘ, খেয়াল-খুশি, বিবেক বুদ্ধি সব কিছুর মধ্যে আলাদা কিছু কাজ করে। যা কিনা যৌবনে পর্দাপন অথবা যৌবনের হাতছানি তখন তাদের চার পাশে যা দেখে তাই সবি রঙিন মনে হয় ভাল লাগে বিশেষ করে ঐ সময়টাতে যেটা মন্দ ও অপছন্দের সেটা তাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠে।

এ সময়টাতে যদি কোন সংসারে কর্তা ব্যক্তির সেটা হতে পারে মা-বাবা অথবা বড় ভাই-বোন, তারা যদি অভিভাবক হিসেবে জোরালো ভুমিকা পালন না করে তবে নিশ্চিন্তে নির্দিধাই একজন কিশোর-কিশোরী প্রথমেই শুরু হয় ক্লাশ ফাঁকি এরপর পর্যায়ক্রমে চায়ের দোকান, ফুসকা ও চটপটি ক্যান্টিন এরপর বাহিরে আড্ডা পার্টি আনন্দ বিনোদেন বয়সের চাপ আর যৌবনের তারনায় শুরু হয় কিশোর কিশোরীর মাঝে দৌড়-ঝাপ। এক সময় চটপট্টি ফুসকার মাঝে আর্বিভাব ঘটে কমল পানীয়- বিড়ি সিগারেটে, সময়ের সাথে সাথে পা রাখে কমল পানীয় নামক অনেক যৌন উত্তেযক নেশা জাতীয় দ্রব্যের।

এক সময় পরিচয় ঘটে চলমান সর্বোচ্চ নেশা জাতীয় দ্রব্য গাঁজা, হিরোইন ও ইয়াবা সহ অনেক কিছুরী। শুরু হয় অপরাধ যগতের নানা অঙ্গনে বিচরণ- সংঘটিত করে অপরাধ বনে যায় অপরাধী দোষ কাদের? কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীর নাকী পরিবারের কর্তাদের? বেগম সুফিয়া কামাল বলেছিলেন- তোমরা শিক্ষিত মা দাও আমি শিক্ষিত জাতী দিবো। একজন নারী যখন মা হয় নিশ্চয়ই তার সংসার থাকে তবে সম্প্রতি সময়ে অনেক নারীরাই সংসারের প্রতি উদাসীন কেন? শিশুরা কাঁদামাটি তাদের যেমন খুশি তেমন ভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। কেবল মাত্র একজন মা-ই পারে একজন সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। পৃথিবীতে মায়ের কোন বিকল্প নাই। প্রতিটি নারীর ভুমিকাই প্রত্যেকটি পরিবারের সদস্য হতে পারে এক একজন আদর্শ নাগরিক।

পরিবার উন্নত হলে, সমাজ সংস্কার হবে, সমাজ সংস্কার হলে, দেশ পরিছন্ন হবে, দেশে পরিছন্ন পরিবেশ তৈরি হলে, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতিসহ সকল সেক্টরে সহনশীল পরিবেশ তৈরি হবে। যার ফলে প্রতিটি খাতে তৈরি হবে জবাবদিহিতা, জবাবদিহিতা সু-নিশ্চিত হলে সমাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আর যখন সামগ্রীকভাবে সমাধিকার দৃশমান থাকবে তখন গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই সর্বোপরি প্রত্যেকটি পরিবারের নারীরা বাহিরে যাই করুনা কেন সংসারে সন্তানকে ধর্মীয় অনুশাসন ও সু-শিক্ষার মধ্য দিয়ে সন্তানকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে তৈরি করা প্রয়োজন। তবে বলা সার্থক আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। মনে রাখা প্রয়োজন- শিক্ষাই জাতীর মেরুদন্ড নয়, সু-শিক্ষাই জাতীর মেরুদন্ড।

You might also like

advertisement