রাজধানীতে মৃত্যুদূত মিনিবাস

advertisement

বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-বিক্ষোভ ও নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনায় সড়কে পড়ছে লাশ। খালি হচ্ছে মায়ের কোল। আর এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগ ঘটাচ্ছে মিনিবাস। যেন সড়কে মৃত্যুদূতের ভূমিকায় নেমেছে যানটি।

সর্বশেষ গত ১৯ মার্চ ট্রাফিক সপ্তাহ চলার মধ্যেই প্রগতি সরণিতে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরই বাসচাপায় মারা যান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। এ ক্ষেত্রেও যমদূতের ভূমিকায় ছিল ‘সুপ্রভাত’ কোম্পানির মিনিবাস।

এছাড়া গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে ‘জাবালে নূর’ নামের অপর এক কোম্পানির মিনিবাস চাপাতেই মারা যায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীর সড়ক থেকে মিনিবাস তুলে দিয়ে বড় বাস নামানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীতে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা মিনিবাসের কারণেই ঘটছে, এমন তথ্য উঠে এসেছে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণায়। ঢাকায় সামপ্রতিক আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সবকটিতেই বাসের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করেছে এআরআই।

সংস্থাটির গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই মিনিবাসের কারণে ঘটেছে। ২০১৭ সালে শুধু রাজধানীতে ২৬৩টি দুর্ঘটনার তথ্য দিচ্ছে এআরআই। তাতে ২৭৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৩৫৮ জন আহত হয়েছিল। ওই বছর ১৪৫টি দুর্ঘটনায় মিনিবাসের সম্পৃক্ততা ছিল। এছাড়া ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬ জন নিহত হয়। এর মধ্যে ১৩৪টি দুর্ঘটনার কারণ মিনিবাস।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় মিনিবাস জড়িয়ে যাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনার জন্য মিনিবাসই বেশি দায়ী। ঢাকা শহরে মিনিবাসের সিস্টেমটাই বিশৃঙ্খল। মিনিবাসের চালকরা অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া চলাচল করে বেশি। যাত্রীর জন্য ঝুঁঁকিপূর্ণভাবে বাস চালায়। তাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও বেশি।

দুই বাসের রেষারেষিতে ঘটে দুর্ঘটনা:প্রায় দু’কোটি মানুষের বাস রাজধানীতে। আয়তন ১১৬ দশমিক ৮ বর্গমাইল। এখানে যাতায়াতের জন্য বাস রুট রয়েছে ১২২টি। এসব রুটে চলাচল করে সাড়ে ৬ হাজার বাস-মিনিবাস। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেকই মিনিবাস। ‘ব’ সিরিজে চলে বড় বাস এবং ’জ’ সিরিজে মিনিবাস। মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বড় বাস ঘন ঘন সড়কে লেন পরিবর্তন করতে পারে না, সাধারণত নির্ধারিত স্থানে যাত্রী উঠানো-নামানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু মিনিবাস এতটাই বেপরোয়া যে সুযোগ পেলেই লেন পরির্বতন করে। হুট হাট করে যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলে। শুধু এখানেই শেষ নয়। বেশি ট্রিপের আশায় অন্য বাসের সঙ্গে দ্রুত যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। আর এই রেষারেষির কারণেই বড় বাসের তুলনায় মিনিবাস বেশি দুর্ঘটনায় পড়ে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে সুষ্ঠু বাস ব্যবস্থাপনার স্বার্থে অবিলম্বে মিনিবাস সার্ভিস তুলে দেওয়া জরুরি। মিনিবাস তুলে দিয়ে বড় বাস সার্ভিস চালু করা হলে এক দিকে যেমন কমবে দুর্ঘটনা, তেমনি নগরবাসী পাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা ।

সম্প্রতি রাজধানীতে সুষ্ঠু বাস ব্যবস্থাপনার স্বার্থে ২০ দফার সুপারিশমালা তৈরি করেছেন মহানগর ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মফিজউদ্দিন আহমেদ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হচ্ছে, ঢাকা শহরের মূল সড়কগুলো থেকে সব ছোট বাস (মিনিবাস) তুলে দিয়ে দুই দরজা বিশিষ্ট বড় বাস নামাতে হবে। এতে সামনের দরজা দিয়ে যাত্রী উঠবে এবং পেছনের দরজা দিয়ে নামবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, চালকসহ ৩১ সিটের গাড়ি হচ্ছে মিনিবািস। চালকসহ ৫১ সিট হচ্ছে বড়বাস। তিনি বলেন, যাত্রীসেবা দ্রুত দেওয়ার তাগিতে রাজধানীতে ১৯৮১ সালে আমদানি করা হয়েছিল রুশা কোম্পানির মিনিবাস। ১৯৯৬ সালে মিনিবাস চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ হয়।

কিন্তু আইন কড়াকড়ি না থাকার কারণে মিনিবাস হয়ে গেছে এখন ৪০ সিটের বাস। তিনি বলেন, মিনিবাসে খাটো মানুষ চাপাচাপি করে বসতে পারে, আর লম্বা মানুষের পোহাতে হয় ভোগান্তি। যারা চলেন তারাই আঁঁচ করতে পারবেন। ঢাকা শহরে মিনিবাসের পরিবর্তে বড় বাস বেশি থাকা উচিত।

দুর্ঘটনার জন্য মিনিবাসই দায়ী কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে ওসমান আলী বলেন, বাসের সিটের কারণে তো আর দুর্ঘটনা হয় না, বডি বৃদ্ধির জন্যও হয় না। দুর্ঘটনার মূল কারণ চুক্তিভিত্তিক বাস চালানো। কারণ মালিক গাড়ি (বাস) চুক্তিতে দিয়ে দেয়, সারা দিনের জন্য আড়াই হাজার বা তিন হাজার টাকায়। আর চালক গাড়ির তেল কেনে,গ্যাস কেনে, চাঁদা দেয়। আর এ টাকার জন্যই চালকরা প্রতিযোগিতায় নামে। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। শ্রমিক ফেডারেশনের এ শীর্ষ নেতা আরো বলেন, এটা বন্ধ করতে হবে। আগে যেমন টিকেট সিস্টেম ছিল, সেই সিস্টেমে চলে যেতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের উপ-কমিশনার লিটন কুমার সাহা বলেন, আমাদের ডিএমপির (ঢাকা মহানগর) সড়ক খুব বড় না। বলতে গেলে সবই ছোট সড়ক। দুর্ঘটনার মূল কারণ পারপারি। তিনি বলেন, একজন মালিক চালক নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষ-অদক্ষ দেখেনা। সে ধান্ধায় থাকে কোন জায়গা থেকে আমি (মালিক) বেশি বেনিফিট পাবো। তবে আমরা এগুলো বন্ধ করার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এবার হয়তো দেখবেন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

পুলিশের এ কর্তকর্তা আরো বলেন, বাসের প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে আমরা হাইরাইজ ভবনে ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থা করছি। যাতে উপর থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, কোন গাড়িগুলো প্রতিযোগিতা করছে। পরে ওইসব গাড়ি ধরে ডাম্পিংয়ে পাঠিয়ে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে দু’টি মিনিবাসের রেষারেষিতে পড়ে হাত বিচ্ছিন্ন হয় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব হোসেনের। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১৬ এপ্রিল মারা যান রাজিব। ২০ এপ্রিল রাতে বনানীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি মিনিবাসের চাপায় ২১ বছর বয়সী তরুণী রোজিনার ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে ২৯ এপ্রিল মারা যান রোজিনা।

এছাড়া গত বছর ডিসেম্বরে গুলশানের শাহজাদপুরে মিনিবাসচাপায় স্কুলছাত্রী, বিজয় সরণীতে মিনিবাসের ধাক্কায় অটোরিকশা আরোহী এক তরুণ, অক্টোবরে দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়ে এক তরুণ, এরও আগে গত সেপ্টেম্বরে মিনিবাসের চাপায় একাত্তর টেলিভিশনের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের স্বার্থে (গাড়ি বিক্রির জন্য) এক সময় মিনিবাস আমদানি করেছিল। কিন্তু এটা ছিল রীতিমতো যাত্রীসেবার নামে প্রতারণা। বিষয়টি আঁঁচ করতে পেরে ১৯৯৬ সালে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদ (তখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠিন হয়নি) মিনিবাসের নিবন্ধন বন্ধ রাখা হবে বলে আরটিসিকে (রিজনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি) জানিয়ে দেয়। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত থাকার পরও আইন লঙ্ঘন করে গাড়িগুলো (মিনিবাস) চলছে। আমি মনে করি সরকারের এনফোর্সকারী প্রতিষ্ঠান এবং মালিক সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় এগুলো এখনো চলছে।

You might also like

advertisement