উপজেলা নির্বাচন আইন-শৃংখলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ

advertisement

চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ-অসন্তোষ। স্থানীয় প্রভাবশালী প্রার্থীদের হস্তক্ষেপের কারণে অনেক স্থানে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার, জনসংযোগ, মিছিল-মিটিং ও উঠান বৈঠকে বাধাদান, ভোটকেন্দ্র দখলসহ নানা রকম হয়রানি করছেন প্রভাবশালী প্রার্থীরা। তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় অন্য প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকটা অসহায়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও ইতিমধ্যে হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন। সুষ্ঠু-নিরাপদ নির্বাচন করাও এখন আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপথ্যে থেকে অনেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা নির্বাচন কমিশনকে বলছেন, তবে তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে স্থানীয় প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদের কথা বললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাঠে তার প্রতিফলন নেই। ফলে সর্বত্রই যাচ্ছে ভুল বার্তা।

বিএনপি নির্বাচনে না আসায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগেরই নেতারা। এছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় পার্টি (জেপি), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন একটি দলের প্রার্থীরা নানা কায়দায় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। অন্য প্রার্থীদের এ ক্ষেত্রে কিছু করার সুযোগও থাকছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসেনি, এরপরও এতো হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন কী? আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নাসিম বলেন, প্রশাসনকে দিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু করার চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু অতি উত্সাহী প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে ছোট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছোট ছোট লাট আছে বিভিন্ন জায়গায়, তারা নিজেদেরকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান মনে করে। স্থানীয় পর্যায়ে এসব ছোট ছোট লাট উপজেলা নির্বাচনে তার প্রার্থীকে জেতানোর জন্য এমন কোনো কাজ নেই যেটা তারা করে না। এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা চান। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কিছু কিছু প্রভাবশালী নেতা এখনো প্রশাসনকে চাপ দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব তথাকথিত ক্ষমতাধর ব্যক্তি কারা? যারা প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে চায়, তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করব, আপনারা ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। এ ধরনের কোনো কারচুপির চেষ্টা যেন না হয়, দেখবেন।

২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট শুরুর দেড় ঘণ্টার মাথায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ভোটকেন্দ্র দখল নিয়ে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে ব্যর্থ হয়ে দুর্বৃত্তরা গুলি চালালে কনস্টেবল ফরহাদ গুলিবিদ্ধ হয়। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আতিকুর রহমান মিয়া আনারস প্রতীকের প্রচারণায় ওই উপজেলার বহুগ্রাম ইউনিয়নের বলনারায়ন বাজারে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী এম এম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (মুক্ত মুন্সী)’র সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উভয় গ্রুপের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে অনেকে আহত হন। এছাড়া ভাবড়াশুর ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের মনোজ বিশ্বাসের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় মহিউদ্দিনের কর্মী-ুসমর্থকরা। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সমর্থকদের সংঘর্ষে দু’জন নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, কালাই উপজেলার পুনট বাজারের মোন্নাপাড়া গ্রামের আফতাব হোসেন ও মাহিষ্যপাড়ার রতন মহন্ত।

কোনো কোনো উপজেলায় নৌকা মার্কার প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের আক্রমণে এলাকা ছাড়াও হতে হয়েছে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। আবার ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতাধরদের ইন্ধনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের সখ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিনই কোনো না কোনো উপজেলায় ঘটছে সহিংসতার ঘটনা। বাসাইলে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হন ২০ জন। আখাউড়ায় আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি এলাকায় গণসংযোগকালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ নজরুল ইসলামের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিদ্রোহী প্রার্থী হাজি মহসীন আলী মিয়া।

আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে একাধিক প্রার্থীর কারণে দলীয় কোন্দলের সৃষ্টি হচ্ছে, এটি সত্য। তবে তা সাময়িক। নির্বাচনের পরই আবার সবাই এক হয়ে যাবে। এটি মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক কোন্দল। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের একজন সদস্য জানান, কোন্দল যেন সহিংসতায় না গড়ায় সেজন্য মাঠ প্রশাসনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। তিনি চান, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যোগ্য প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসুক। যারা সহিংসতায় জড়াবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

You might also like

advertisement