কোচিং-নোট গাইডও মেধাবিকাশ প্রতিবেদক বৃত্তের বাহিরে

এম.এ জলিল রানা

advertisement

কোচিং-নামেনি সাইনবোর্ড চলছে কোচিং নামি অতিরিক্ত ক্লাস সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক শিক্ষদের কোচিং ও প্রাইভেট বন্ধ ঘোষণা করলেও অতিরিক্ত ক্লাসের নামে এখনো চলছে কোচিং ব্যবসা। পার্থক্য শুধু এতোটুকুই যে কোচিং প্রাইভেট এখন হয়েছে অতিরিক্ত ক্লাস।

কোচিং বাণিজ্যে জাড়ানোর সুযোগ নেই শিক্ষকদের। সরকারি ও বেসরকারি সকল স্কুল এবং কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের সরকারের জারি করা নীতিমালাকে বৈধ ঘোষণা করে এ রায় দিয়েছে মহামান্য হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, সরকার রাষ্ট্রের কল্যাণে যে কোন সময় যে কোন ইস্যুতে আইন, বিধি ও নীতিমালা জারি করতে পারে। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জালিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গত ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ বৃহস্প্রতিবার এ রায় দেন।

রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ঢালাওভাবে যে কোচিং বাণিজ্য চলছিলো হাইকোর্টের রায়ের ফলে তা নিষিদ্ধ হলো। তিনি বলেন, গর্ভনমেন্ট সার্ভেন্ট (কনডাক্ট) রুলস এবং গর্ভনমেন্ট সার্ভেন্টস (ডিসিপ্লিন এন্ড আপিল) রুলস পর্যালোচনা করে আদালত রায়ে বলেছেন যে একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী সরকারি চাকরির বাইরে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোন ব্যবসা বা বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হতে পারবেন না। ওই সব আইনের ধারাবাহিকতায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা এসেছে। ফলে এটা অসাংবিধানিক নয়। জানা গেছে, ২০১২ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে একটি নীতিমালা জারি করে সরকার।

ওই নীতিমালার ভূমিকায় বলা হয়, দেশের সরকারি ও বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির শিক্ষক দীর্ঘদিন যাবত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোচিং পরিচালনা করে আসছেন। এটি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যেকারনে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোর্চি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যা পরিবারের উপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং এ ব্যয় নির্বাহে অভিভাবকগণ হিমশিম খাচ্ছেন।

এছাড়া অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে কোচিং এ বেশি সময় ব্যয় করছেন। এক্ষেত্রে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা এবং অভিভাবকগণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকার এই নীতিমালা প্রণয়ন করে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোন শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবে না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। প্রণীত এই নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আইডিয়াল স্কুল গার্ডিয়ান ফোরাম ও অভিভাবক অ্যালায়েন্সের সভাপতি, ধানমন্ডি গর্ভনমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল এবং মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলের কয়েকজন শিক্ষক।

বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা ওই রিটের উপর রুল জারি করে হাইকোর্ট। রুলে বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা কোন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। ওই রিটের রুলের উপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ এ রায় দেন। রিট আবেদনগুলো খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্ট রায়ে বলেন, একটি আধুনিক সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সময়ে সময়ে পরিপত্র, নীতিমালা, গাইডলাইন, সার্কুলার, বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে সরকার। এটা সরকারের সাংবিধানিক অধিকার।

এই পরিপত্র, নীতিমালা, গাইডলাইন, সাকুলার বিজ্ঞপ্তি জারির জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাশ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সুতরাং কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা অসাংবিধানিক ও বেআইনিক ও বেআইনি নয়। যেহেতু বেআইনি নয় সেহেতু এই নীতিমালার বাইরে কোন কোচিং করানো যাবে না। রায়ে বলা হয়, গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন সেক্টরকে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে। ২০১৭ সালের ৬ জুলাই দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রধান শিরোনাম ছিলোঃ কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে দুদকরে অভিযান শুরু এটিকে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলাম এ অভিযান চলমান থাকা অতিব ও জরুরী দেশব্যাপী একাধিক অনুসন্ধানে জানা গেছে কোচিং সংক্রান্ত এক ভয়াবহ তথ্যও চিত্র পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে স্কুল কলেজে কোনরকম হাজিরা দিয়েই শিক্ষার্থীদের ছুটতে হয় কোচিং সেন্টারে।

বর্তমানে স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার বদলে কোচিং সেন্টার গুলো হয়ে উঠেছে আদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু দিন আগের কথা। সে সময়ে সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন। কোচিং খাতে বাৎসরিক লেনদেন প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে এ লেনদেন এর পরিমান ৫০ হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশী। মূলত কোচিং ব্যবস্থাপনাটি অনৈতিক এটি মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে নাজুক করে ফেলেছে। প্রায় ৫ বৎসর আগে শিক্ষামন্ত্রনালয় কোচিং বাণিজ্য বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন এ নীতিমালা অনুসারে সরকারি বে-সরকারী নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফলে কলেজ ও মাসাদ্রার কোন শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থীকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। নীতিমালা লংঘননের ক্ষেত্রে ৫ ধরণের শাস্তির কথা বলা ছিল। তবে এই নীতি মালায় বাণ্যিজ্যিক কোচিং গুলো বন্ধের বিষয়ে কোন উল্লেখ নেই।

এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বিঘ্নে নির্দীধায় অবাধে চালানো হচ্ছে কোচিং বাণিজ্য। সময় অনেক গড়িয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রন প্রয়োজন। শুধু আইন বা নীতিমালা পরিবর্তন করে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সরকাররের সৎ ইচ্ছা থাকা প্রয়োজন কারণ এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা একটি বড় ও শক্তিশালি চক্র। রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালী মহলের ছত্র ছায়ায় চলে এই ব্যবসা। শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন না। তবে নীতিমালায় বলা আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ১০ জন শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন। আমি মনে করি নীতিমালার এই
ফাকটি অনতীবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশে শ্রেণী বিন্যাসে গড়ে উঠা কোচিং সেন্টার যেমনঃ পিএসসি, জেএসসি/জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি, বৃত্তি কোচিং, মেডিকেল, নাসিং, ক্যাডেট, শিক্ষক নিয়োগ, বিসিএস ইত্যাদি।

মূলত সব গুলোই কড়া নজরদাড়িদে রাখা প্রয়োজন কারণ কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরাই প্রশ্ন ফাস চক্রের সাথে কোথাও না কোথাও লিংক থেকে যায়। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়ঃ কোথাও ধুয়া দেখলে সেখানে আগুন আছে বলে ধারনা করা যায়। নোট গাইডঃ সারাদেশে নেট গাইড গাইড বইয়ে বাজার সয়লাব, চলছে নিষিদ্ধ নোট ও গাইডের রমরমা ব্যবসা। চলতি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের টার্গেটে রেখে নতুন বছররের শুরুতই দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বইয়ের দোকানে অবৈধ নোট গাইডে সয়লাব হয়ে গেছে। এসব বইয়ের দোকানে প্রকাশ্যে চলছে নিষিদ্ধ এসব নোট-বুকের প্যাকেজ ব্যবসা। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধারণাপত্র বিক্রি করছেন, যা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে সৃজনশীল ধারণা পেতে সাহায্য করছে ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যেভাবে তাদের বই দিচ্ছেন তারাও সেই ভাবে বাজারে বই বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে। বাজারে পাঞ্জেরী, অনুপম, যুপিটার, ইন্টারনেট, সংসদসহ অসংখ্যা প্রকাশনার বই রয়েছে।

প্রকাশনাভেদে তৃতীয় শ্রেণির নোট-গাইডের মূল্য ৩৩০ থেকে ৫০০, ৪র্থ শ্রেণির ৪১০ থেকে ৫৫০, ৫ম শ্রেণির ৩৮০ থেকে ৫৫০, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ৬৮০ থেকে ৭০০, ৭ম শ্রেণির ৭১০ থেকে ৮৫০, ৮ম শ্রেণির ৯৮০ থেকে ১১শ এবং ৯ম শ্রেণির এক সেট নোট-গাইডের মূল্য ২৯শ থেকে ৩২শ টাকা পর্যন্ত মূল্যে কেনা-বেঁচা চলছে। নিষিদ্ধ এ নোট গাইড বিক্রি বন্ধ করতে হলে সর্বপ্রথম উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে রাজধানী ঢাকা শহরের বাংলাবাজারে। যেখানে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার বই নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। কর্তৃপক্ষ সেখানে অভিযান চালায় না কেন এমন প্রশ্ন ত থেকেই যায়।

সরকার নোট গাইড নিষিদ্ধ করেছে এটা বাস্তবায়নের জন্য জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাগণদের নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন। অবৈধ ও নিষিদ্ধ হওয়া নোট গাইড বই বাজারজাত করতে, শিক্ষার্থীদের কিনতে ও বুক লিষ্টে লিখতে যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসাধু শিক্ষক, শিক্ষক সমিতির নেতা-বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও যে কোন ব্যাক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। মেধাবিকাশঃ একাধিক অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে কমল মতি শিক্ষার্থীদের মেথা বিকাশের প্রধান অন্তরায় প্রায়ভেট কোচিং এবং নোট গাইড। কারণ নোট গাইডে যেমন স্বল্প পরিসরে প্রশ্ন পত্র সাজানো হয় এবং শির্ক্ষীকে ধারণা দেওয়া হয়।

পুরো বিষয় না পড়ে অল্প কিছু প্রশ্ন পড়াশুনা করলেই পাশ করা সম্ভব। একই ভাবে প্রাইভেট কোচিং এ মূল যে ধারণা সেখানেও চিত্র একি রকম। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি শ্রেণীর ক্ষেত্রে পুরো বিষয় সম্পর্কে বেসিক ধারণা থাকছেনা। যাকে বলা যায় কাটছাট করে পড়ানো হয়। সম্প্রতি জ্ঞান প্রতিযোগিতার লড়ায়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক বৃন্দু চরম বিপাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাতের অনেকটাই বইয়ের বুঝা নিয়ে এক কোচিং থেকে আরেক কোচিংয়ে দৌরঝাপ লেগেই থাকে। সুতরাং মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে হলে প্রায়ভেট কোচিং এর পাশাপাশি নোট ও গাইড বই বন্ধ করাটা হবে সময় উপযোগি
পদক্ষেপ।

You might also like

advertisement