প্রিয়জনের লাশ শোকার্ত স্বজনের কাঁধে

advertisement

বৃহস্পতিবার বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময় ছাদে উঠে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিলেন যশোরের বৃষ্টি (২৫)। কিন্তু ১৮ তলার সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়ে তাঁর নিথর দেহ। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ঠাঁই হয় তাঁর। তবে পরিবারের আবেদনে ময়নাতদন্ত ছাড়াই ছাড়পত্র মেলে বৃষ্টির। গতকাল দুপুরে যশোরে পৌঁছায় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ৮ তলার উপর থেকে কেবল্ ধরে নীচে নামার চেষ্টাকালে হাত ফসকে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান দিনাজপুরের আব্দুল্লাহ্ আল মামুন। গতকাল সকালে তাঁর মরদেহ শহরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গাস্থ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। মামুন ও বৃষ্টির মতো এ ঘটনায় নিহত আরো ২৩ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রিয়জনের লাশ শুক্রবার নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। এসময় তাদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। এমন অকাল মৃত্যুতে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

আর মা বলে ডাকবেন না মামুন: আমাদের দিনাজপুরের স্টাফ রিপোর্টার জানান, আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের মৃত্যুতে শহরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই ভুলভাল বকছেন মমতাময়ী বৃদ্ধা মা মেহেরুন নেছা। হাতে তসবিহ নিয়ে মাঝে মাঝেই খোঁজ করছেন তার ছেলে মামুন কখন আসবে। ছেলে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু সে ছেলে কখনোই আর মা বলে ডেকে তাকে জড়িয়ে ধরবে না। সে যে চলে গেছে না ফেরার দেশে, এ কথা কে তাকে বোঝাবে?

আব্দুল্লাহ আল মামুন দিনাজপুর শহরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা অন্ধহাফেজ মোড় নিবাসী বনবিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মরহুম আবুল কাশেমের দ্বিতীয় পুত্র। বনানীর এফআর টাওয়ারে হেরিটেজ এয়ারওয়েজ কোম্পানিতে প্রধান হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। তিন দফা জানাজা শেষে শহরের ফরিদপুর কবরস্থানে পিতার পাশে মামুনকে সমাহিত করা হয়। এসময় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। নিহতের বড়ভাই বিরল মহিলা ডিগ্রী কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মোশাররফ হোসেন জানান, ‘এলাকায় ও পরিবারে মামুন খুবই আদরের ছিল। আল্লাহ এমন একজন ভাল ভাইকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিলেন!’ মামুন প্রায় ১৫ বছর ধরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঢাকার কল্যাণপুরের বাড়িতে বসবাস করতেন।

বৃষ্টির বাড়িতে আহাজারি: যশোর অফিস জানায়, বনানী অগ্নিকাণ্ডে নিহত যশোরের মেয়ে শেখ জারিন তাসমিম বৃষ্টি (২৫) ভবনটির ইইউআর সার্ভিস বিডি লিমিটেডের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগে কাজ করতেন। আগুনে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। মর্গে জামাকাপড় ও স্যান্ডেল দেখে আত্মীয় ও সহকর্মীরা তাঁর লাশ শনাক্ত করেন। জানাজা শেষে গতকাল বিকালে জেলার কারবালা গোরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সহপাঠী যশোরের পুরাতন কসবা এলাকার কাজী সাদ নূরের সঙ্গে বিয়ে হয় বৃষ্টির। কাজী সাদ নূর ঢাকার রেডিসন হোটেলে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। চাকরির সুবাদে ঢাকার খিলক্ষেতে বসবাস করতেন তারা। দুই বোনের মধ্যে বৃষ্টি ছিলেন ছোট। চাকরির কারণে বাবার বাড়িতে আসা-যাওয়া কম ছিল। বৃষ্টির বাবা মটর পার্টস ব্যবসায়ী শেখ মুজাহিদুল ইসলাম খবর পেয়ে বৃহস্পতিবারই মেয়ের মরদেহ আনতে ঢাকায় যান। দিন তিনেক আগে বৃষ্টির মা গিয়েছিলেন ঢাকায়। লাশের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে বৃষ্টির শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, দেবর একসঙ্গে পৌঁছান যশোর শহরের বেজপাড়া মেইন রোডের বাড়িতে। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ।

কেবল্ বেয়ে নামতে গিয়ে পড়ে মারা যান সাজ্জাদ: গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জীবনের শেষ সময়ে পারভেজ মৃধা সাজ্জাদ (৪৬) তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের ভবনে আগুন লেগেছে। এখান থেকে বেরুতে পারব কি না জানি না। আমার জন্য দোয়া করো।’ অগ্নিকাণ্ডের সময় দুপুর ১ টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে এই শেষ কথা হয় সাজ্জাদের। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সাজ্জাদ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের বলুগ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে। তিনি ওই টাওয়ারের ১১ তলায় অবস্থিত কার্গো পরিবহন কোম্পানি স্ক্যানওয়েল লজিস্টিকসের সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একমাত্র ছেলে সিয়াম ও স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। সিয়াম রাজধানীর মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

নিহতের স্বজনরা জানান, ঘটনার সময় সাজ্জাদ জোহরের নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় আগুন দেখে জীবনের শেষ সময়টুকু স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। আগুন থেকে বাঁচতে ডিশলাইনের কেবল্ বেয়ে নামার চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে যান সাজ্জাদ। ১১ তলা থেকে ৭ তলা পর্যন্ত নেমে এসির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে মারা যান তিনি। বৃহস্পতিবার বিকালে সাজ্জাদের মৃত্যুর খবর গোপালগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। শুক্রবার সকালে নিজ গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

‘তোমার জন্য আমি কিছুই রেখে যেতে পারলাম না’: মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, মৃত্যুর এক মিনিট আগে স্ত্রী মাহমুদাকে ফোন করে তুষার বলেছিলেন, ‘মাহমুদা আমি আর বাঁচতে পারলাম না। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি, একটু পরেই আমি নিশ্চিত মারা যাচ্ছি, তুমি আমার অসহায় বাবা মা ও দুই ভাইকে দেখে রেখ। তোমার জন্য আমি কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। তোমার ভালবাসা, স্নেহ, মায়া-মমতা মৃত্যুর পরও আমার কাছে গচ্ছিত থাকবে।’ এভাবেই শেষ কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছিলেন তুষার। এফআর টাওয়ারে আগুনে পুড়ে নির্মম ভাবে নিহত হয়েছেন জাহিদুল ইসলাম তুষার (৩২)। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ১০ নং গোড়াই ইউনিয়নের ভানুয়াবহ গ্রামের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। তিনি ভবনটির হেরিটেজ এয়ারওয়েজ কোম্পানিতে টিকেটিং এন্ড ইনফরমেশন বিভাগের সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তুষারের মা নাহার বেগম ও পিতা এছাক আলী। গতকাল নামাজে জানাজা শেষ গ্রামের কেন্দ্রীয় গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো. একাব্বর হোসেন এমপিসহ উপজেলা প্রশাসন তুষারের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে।

স্ত্রীকে ফোন করে দোয়া চেয়েছিলেন আতিকুর: শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, আগ্নিকাণ্ডে নিহত শরীয়তপুরের মির্জা আতিকুর রহমানের (৩৮) বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তিনি ওই ভবনের ১৩ তলায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাঁর বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজেলার শৌলপাড়া ইউনিয়নের পূর্বসারেঙ্গা গ্রামে। তার মৃত্যুতে শোকে মাতম করছেন মা, ভাই-বোন, স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ আত্মীয়-স্বজনরা।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আতিকুর স্ত্রী, ১০ বছর বয়সী মেয়ে মির্জা তাসফিয়া আক্তার তানহা ও চার বছরের ছেলে মির্জা রাফিউর রহমানকে নিয়ে ঢাকার মানিকদি বাজার ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি স্ক্যানওয়াল লজিস্টিক বাংলাদেশ (প্রা.) লি. কোম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এফআর টাওয়ারের ১৩ তলায় অফিস ছিল তার।

আগুন ছড়িয়ে পড়েলে অফিসে আটকা পড়েন আতিকুর। পরিবার অনেক খোঁজ করেও তাকে পায়নি। রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহ শনাক্ত করেন আতিকুরের চাচাতো ভাই মির্জা বাদল। পরে শুক্রবার মরদেহ শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর দুইটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

স্ত্রী এনি আক্তার পলি বলেন, তখন দুপুর ১টা ১০মিনিট। আমার মোবাইলে আতিকুর ফোন করে। আমাকে বলে, ‘আমার জন্য দোয়া করো।’ তখন আমি বলি, ‘কেন এ কথা বলছো?’ তখন বলে, ‘অফিসে আগুন লাগছে। ধোঁয়ায় অফিস ভরে গেছে, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।’

বাবাকে হজ করাতে পারলেন না রাব্বি: সাঁথিয়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, আমির হোসেন রাব্বি (২৯) পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী শেখের একমাত্র ছেলে। মা-বাবার দুঃখ লাঘবের জন্য প্রায় ৯ বছর আগে স্নাতকোত্তর শেষে এফআর টাওয়ারে একটি বিদেশি কোম্পানির চাকরিতে যোগ দেন। সুখেই চলছিল তাদের সংসার। মা ছেলের বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করলে, ২০২০ সালে বাবাকে হজ করিয়ে পাকা বাড়ি তৈরি করে বিয়ে করবেন বলে মাকে জানান। এ কথা বলতে বলতে মা রত্না খাতুন বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন।

কৃষক আইয়ুব আলী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার আর হজ করা হলো না। আল্লাহ আমার ছেলের ইচ্ছা পূরণ করলো না।’ রাব্বির সহকর্মীদের ফোনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পান তার মা-বাবা। খবর পেয়ে নিকটতম আত্মীয়রা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে রাব্বির লাশ সনাক্ত করেন। বৃহস্পতিবার রাতেই হাসপাতাল থেকে রাব্বির লাশ হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার দুপুরে লাশ চরপাড়া গ্রামের বাড়িতে আনলে স্বজন ও গ্রামবাসীর আহাজারিতে এক হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। রাব্বির মুখমন্ডলসহ শরীরের প্রায় ৯০ ভাগই আগুনে ঝলসে গিয়েছিল। জুমার পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

না’গঞ্জে রাব্বি ও জাফরের দাফন: নারায়ণগঞ্জ স্টাফ রিপোর্টার জানান, বনানীর অগ্নিকাণ্ডে নিহত ফজলে রাব্বি ও আহমেদ জাফরের লাশ তাদের নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে ফজলে রাব্বির লাশ শনাক্তের পর গতকাল ভোরে উপজেলার ফতুল্লা থানার ভূঁইগড় এলাকার বাড়িতে নিয়ে আসেন স্বজনরা। বাদ জুমা স্থানীয় মসজিদে জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়। সকালে ফতুল্লার ভূঁইগড়ে নবীনগর ভিলায় গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারি আর আর্তনাদ। পরিবারের মূল উপার্জনকারী বড় সন্তানের এই করুণ মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রাব্বির বৃদ্ধ বাবা জহিরুল হক। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, বনানীর এফআর টাওয়ারের ১২ তলায় ফ্লোগাল লজিস্টিকস নামের একটি ফ্রেইড ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিতে কাস্টমার সার্ভিস এন্ড ডকুমেন্টেশন বিভাগে এক্সিকিউটিভ পদে কাজ করতেন ফজলে রাব্বি। ঘটনার দিন দুপুর ১২টা থেকে কয়েকবার বাড়িতে ফোন করে কথা বলেন রাব্বি। ১টা ৫৩ মিনিটে শেষ কথা হয় ছোট ভাই ও বাবার সাথে। রাব্বি তাদের জানিয়েছিলেন, অফিস ফ্লোরে ধোঁয়ায় আটকা পড়ে গেছেন তিনি। বাঁচার জন্য জানালা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়বেন কিনা সেই সিদ্ধান্ত চেয়েছিলেন ছোট ভাই ও বাবার কাছে। কিন্তু তারা রাব্বিকে বারবার নিষেধ করেছিলেন। এই ছিল পরিবারের সঙ্গে রাব্বির শেষ কথা।

চাঁদপুরের ৩ জন নিহত: চাঁদপুর প্রতিনিধি ও কচুয়া সংবাদদাতা জানান, বনানীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চাঁদপুরের ৩ জন নিহত হয়েছেন। এরা হলেন: জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৫নং গুপ্টি ইউনিয়নের শ্রিকালিয়া গ্রামের মুন্সি বাড়ির মকবুল আহমেদের ছেলে আবদুল্লাহ আল ফারুক তমাল, মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৩নং খাদেরগাও ইউনিয়নের নাগদা গ্রামের বেনু প্রাধানিয়ার ছেলে রেজাউল করিম রাজু এবং কচুয়া উপজেলার বাইছারা গ্রামের আতাউর রহমান মুন্সী চঞ্চল (৬৩)।

আবদুল্লাহ আল ফারুক তমাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। বন্ধু মিনহাজ উদ্দিন জানান, তমাল ইইউআর বিডি সলিউশন-এ সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। আগুনে তার শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তমাল পরিবারের সঙ্গে ঢাকার সারুলিয়ায় বসবাস করতেন।

অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত রেজাউল করিম রাজু ওই ভবনের পঞ্চম তলার আসিফ ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক। ওই ভবনের পঞ্চম তলার পুরো ফ্লোরটির মালিক ছিলেন তিনি। রাজু ১ ভাই ৩ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। রাজু স্ত্রী ও ২ কন্যা সন্তান নিয়ে বনানীতে থাকতেন। রাজুর চাচাশ্বশুরের ছেলে ট্রাভেল্স ব্যবসায়ী হাজী জসিম উদ্দিন জানান, কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে বৃহস্পতিবার রাতে আমরা তার মৃতদেহ শনাক্ত করে গ্রহণ করেছি। তাকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

আতাউর রহমান মুন্সী এফআর টাওয়ারের দশম তলায় হেরিটেজ ট্যুর এন্ড ট্যাভেলসে চাকরি করতেন। প্রতিদিনের ন্যায় আতাউর রহমান তার ঢাকাস্থ মোহাম্মদপুর বাসা হতে অফিসে যান। পরে অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মৃত্যু হয়। রাতে স্বজনরা নিহতের লাশ সিএমএইচ হাসপাতাল থেকে গ্রহণ করেন। শুক্রবার বিকেলে জানাজা শেষে নিজ বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ার বাইছাড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তিনি স্ত্রী, ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে যান। স্ত্রী তাসলিমা বেগম শিউলী একজন গৃহিণী, ছেলে এরফারুন রহমান (তাজিন) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেয়ে উপমা আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করে ইর্ন্টানি করছেন।

পাটগ্রামে নিহত আবিরের দাফন: পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান, পৌরসভার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার আনজির সিদ্দিক আবির অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। আবির পাথর ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক বাচ্চু ও পাটগ্রাম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তাসরিফা খানম দম্পতির সন্তান। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে আবির ছোট। আবিরের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার মা ও বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

অগ্নিকাণ্ড শুরুর পর থেকে আবির নিখোঁজ ও তার ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল। পরে ওই ভবন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যান উদ্ধারকর্মীরা। আবির ভবনের ১৪ তলায় মিকা সিকিউরিটিজ লি. নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। আবির ঢাকার আইইউবি থেকে বিবিএ শেষ করে ওই কোম্পানিতে যোগ দেন বলে পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন লিপু জানান। তিনি আরো জানান, পাটগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে শুক্রবার বাদ আসর জানাজা শেষে আবিরের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

রংপুরে মোস্তাফিজারকে দাফন: রংপুর স্টাফ রিপোর্টার জানান, বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের একজন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের কাংগুরপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রশীদ মুন্সীর ছেলে মোস্তাফিজার রহমান। শুক্রবার বাদ জুমা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। ৭ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে মোস্তাফিজার ছিলেন অষ্টম । পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মতিঝিলের টিকাটুলীতে থাকতেন। এফআর টাওয়ারের অষ্টম তলায় একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করতেন তিনি।

আংটি দেখে মিথির লাশ শনাক্ত করেন বাবাঃ আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌর শহরের বশিপুর সরদার পাড়া মহল্লার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান মাসুদের একমাত্র কন্যা তানজিলা মৌলি মিথি (২৪) এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন। তার লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসার পর থেকে চলছে শোকের মাতম। মিথি রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন।

মিথির চাচা সালাউদ্দিন সরদার জানিয়েছেন, মিথি ঢাকায় একটি ট্যুরিজম কোম্পানিতে চাকরি করতো। আগুনে আটকা পড়ার পর মিথি তার বাবা এবং তার স্বামীকে ফোন করে বলেছিলো আমাদের অফিসে আগুন লেগেছে আমি আটকা পড়ে আছি। আমাকে বাঁচাও আমি বাঁচতে চাই। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বাবা সান্তাহার থেকে যখন ঢাকা এসে পৌঁছান ততক্ষণে মিথির পুড়ে যাওয়া মরদেহ কুর্মিটোলা হাসপাতালে পড়ে আছে। পরে তার ভোটার আইডি কার্ড ও হাতের আংটি দেখে তার লাশ শনাক্ত করেন বাবা। প্রথমে ঢাকার মিরপুরে তার ১ম নামাজে জানাজা এবং সান্তাহারে বাদ জুমা ২য় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। উল্লেখ্য, মিথির বিয়ে হয়েছে মাত্র ৮ মাস আগে।

You might also like

advertisement