বাংলাবাজার মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে

advertisement

দেশের পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রির সর্ববৃহত্ পাইকারি বাজার রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকা মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে। সরু অলি-গলি ও ঘিঞ্জি এই এলাকার প্রায় প্রতিটি আবাসিক ভবনেই রয়েছে বই ছাপানোর প্রেস ও বাঁধাইখানা। এসব প্রেসে রয়েছে কাগজ ও নানা ধরনের রাসায়নিকের মজুদ, যা অতি দাহ্য। বইয়ের দোকান তো সারি সারি। এমনকি নির্ধারিত মার্কেট ও দোকানের বাইরে রাস্তার উপরেই গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বই বিক্রির অজস্র দোকান। তবে কোথাও নেই অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা।

শঙ্কিত স্থানীয়রা বলেছেন, কোথাও আগুনের সূত্রপাত হলেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়বে গোটা এলাকায়। জরুরি ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যে কোনো সময় নীমতলি ও চুড়িহাট্টার তালিকায় নাম যুক্ত হতে পারে বাংলাবাজার ও আশপাশের এলাকা।

বইয়ের মার্কেট বাংলাবাজার, পুস্তক প্রকাশনাকে কেন্দ্র করে আশপাশের আবাসিক বাড়িতে গড়ে ওঠা প্রেস ও বাঁধাইখানা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শ্রী শ্রী প্রাণবল্লভ জিউ মন্দির, শ্রীশ দাস লেন, শিংটোলাসহ ওই এলাকার প্রায় প্রতিটি আবাসিক বাড়ির নীচেই ছাপাখানা। ছয় তলা কয়েকটি বাড়ির নীচতলায় প্রেস, এর ওপরের দুটি তলায় বাঁধাইখানা, আর উপরের তিনটি ফ্লোরে পরিবারের বসবাস। শিংটোলায় দুটি জরাজীর্ণ বাড়ির দেওয়ালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাইনবোর্ড ঝুলানো, তাতে লেখা, ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন’। তবে এই সতর্কবার্তার তোয়াক্কা না করেই সেখানে চলছে প্রেস ও বাঁধাইয়ের ব্যবসা। বেশিরভাগ আবাসিক বাড়ির মূল ফটক বন্ধ থাকে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে এর ভেতরেই প্রেস ও বাঁধাইখানা। তবে মেশিনের শব্দ জানান দিচ্ছে প্রেস ও বাঁধাইখানার উপস্থিতি।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মোবারক আলী গতকাল রবিবার আলাপকালে বলেন, ‘মেশিনের শব্দে রাতে ঘুমাতে পারি না, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। যেখানে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে, সেখানে রয়েছে বস্তা বস্তা কাগজ, কেমিক্যাল তো আছেই। ঘনবসতির ও চিকন রাস্তার এই এলাকায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকাও সম্ভব হবে না। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করছেন।’

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বাংলাবাজার এলাকাটি রাজধানীর সুত্রাপুর থানাধীন হলেও বইয়ের বাজার ও এটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছাপাখানা-বাঁধাইখানার ওয়ার্ডটি পড়েছে কোতোয়ালি থানায়। ষাটের দশক থেকে এই এলাকায় গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম বইয়ের মার্কেট প্রথমে গড়ে ওঠে ৩৮ নম্বর বাংলাবাজারে। সেই ৩৮ নম্বর বাংলাবাজার মার্কেটের ভবনটিও সময়ের ব্যবধানে এখন জরাজীর্ণ, বিবর্ণ। পলেস্তারা খসে পড়ে কোথাও কোথাও বের হয়ে এসেছে রড। প্রায় আধা কিলোমিটার বিস্তৃত এই এলাকায় বইয়ের দোকান আছে চার হাজারের বেশি। বইয়ের দোকানের মালিক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বাঁধাই কারখানা আছে প্রায় দেড় হাজারের মতো। এখানে কাজ করছেন ১৫ হাজারের বেশি শ্রমিক। আবাসিক ভবনগুলোতে স্থাপিত হয়েছে দুই শতাধিক প্রেস। পুস্তক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মালিক-কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ লোকের বসবাস এই ছোট্ট এলাকায়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুর রহমান মিয়াজী ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবশ্যই এলাকাটি ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ। আবাসিক বাড়িতে এসব প্রেস ও বাঁধাইখানা রাখাই উচিত নয়।’ তিনি জানান, সিটি করপোরেশন থেকে এসব প্রেস ও বাঁধাইখানা পর্যায়ক্রমে অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশনা রয়েছে। আগুনের ঝুঁকি নিয়ে গতকাল সোমবার ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে পুস্তক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হয়। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

পুস্তক বাঁধাইখানার সম্পৃক্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁধাইয়ের কাজে ‘হটমেল গ্লু’ নামের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ব্যবহার করা হয় এক ধরনের আঠা, যা তুঁতে ও ময়দা দিয়ে তৈরি করা হয়। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হটমেল গ্লু ড্রামে ভর্তি করে বাঁধাইখানায় মজুদ রাখা হয়। এছাড়া প্রেস ও বাঁধাইখানাগুলোকে কাগজের গুদাম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই রাসায়নিক, কাগজ সহজেই ও অতি দাহ্য। আগুনের ছোঁয়া পেলেই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে পারে।

পুস্তক বাঁধাই মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান খান কচি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আবাসিক বাড়িতে বাঁধাইখানা গড়ে ওঠার কারণে ঝুঁকি আছে, এটা অস্বীকার করি না। তবে আমরা সতর্ক থাকি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, এখানে আগুন নেভানোর প্রাথমিক ব্যবস্থা আছে। তবে সরেজমিনে পুরো এলাকা ঘুরে কোথাও অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

পুস্তক প্রকাশনা ও বাঁধাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই তারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে বাঁধাইয়ে ব্যবহূত রাসায়নিকের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয় না। এমনকি আবাসিক বাড়িতে প্রেস ও বাঁধাইখানা স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তরেরও কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরও কখনও এটা খতিয়ে দেখেনি, কেউ কখনও জিজ্ঞাসাও করেনি।

স্থানীয়রা জানান, চার বছর আগে পোড়াবাড়ি বিবি রওজার মাজার এলাকায় আগুন লাগে। তখন বইয়ের দোকানপাটসহ অনেক বাড়ি-ঘর পুড়ে যায়।

বাংলাবাজারে এই বইয়ের বাজার গড়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কে এর সঙ্গে জড়িতরা জানান, ব্রিটিশ আমলে প্রথমে চকবাজারে বইয়ের ব্যবসা চালু হয়। এমদাদিয়া, কাসেমিয়া ও হামেদিয়ার মত পুরনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চকবাজারে প্রথম এই ব্যবসা শুরু করে। তখন প্রায় সব বই ছাপা হতো কলকাতায়। তবে কলকাতার ছাপাখানা ও বাঁধাইখানাগুলোতে যারা কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালি। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের পর ধীরে ধীরে এই ব্যবসা ঢাকার চকবাজারে ও চট্টগ্রামে প্রসার লাভ করতে থাকে। পাকিস্তান আমলে বইয়ের এই ব্যবসা চলে যায় পাটুয়াটুলীর সিমসম রোডে। সেখান থেকে ষাটের দশকে আসে বাংলাবাজারে। সর্বপ্রথম বইয়ের মার্কেট গড়ে ওঠে ৩৮ নম্বর বাংলাবাজারে, যেটি তখন ছিল কোলকাতার ‘ইকবাল ওয়াচ’ কোম্পানির মার্কেট। এলাকাটি বাংলাবাজার নামে পরিচিত হলেও কাগজে-কলমে এর নাম পি. কে. রায় রোড।

বাংলাবাজারে বইয়ের মূল মার্কেটটি বাণিজ্যিক এলাকা হলেও আশপাশে প্রেস ও বাঁধাইখানাগুলো গড়ে ওঠেছে আবাসিক বাড়িতে। এই এলাকায় ও আশপাশে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, ঢাকা মহানগর কলেজ, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুসলিম গভমেন্ট হাইস্কুল, ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুল, ইস্ট বেঙ্গল স্কুল, পোগজ স্কুল, ইসলামিয়া স্কুল, কে. এল. জুবলি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট্রাল গার্লস হাইস্কুল ও সরকারি বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুলসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বইয়ের মার্কেট আগুনের ঝুঁকিতে থাকায় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন।

জানা গেছে, কিছু কিছু বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রেস ইতোমধ্যে মাতুয়াইলে ও রূপগঞ্জে চলে গেছে। ‘পাঞ্জেরী’র প্রেস ও বাঁধাইখানা করা হয়েছে গাজীপুরে। এভাবে কিছু কিছু প্রেস ও বাঁধাইখানা অবশ্য বাংলাবাজার এলাকা ছাড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন বলেন, ‘প্রায় ১০-১৫ বছর আগে প্রেসের জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে সরকারের কাছে নিরাপদ জায়গা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। তবে সেটির এখন পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, প্রেস ও বাঁধাইখানাকে আলাদা শিল্প ঘোষণা করে সেটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে এই এলাকাকে বসবাসের জন্য নিরাপদ করা হোক। সরকার নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করলে এখান থেকে প্রেস ও বাঁধাইখানা সরিয়ে নিতে আমাদের আপত্তি নেই।

You might also like

advertisement