নুর ও শামীমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

advertisement

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এর আদালতে রবিবার দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

আসামিরা আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও ১২ জন জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেন। রবিবার বিকাল বেলায় মামলার অন্যতম দুই আসামি নুর উদ্দিন এবং শাহাদাত হোসেন শামীমকে আদালতে তোলার পর তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

তাদের মধ্যে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাদ্রাসা কমিটির সহ-সভাপতি রুহুল আমিনের নামও রয়েছে। হত্যার ঘটনার সাথে জড়িত বেশিরভাগই উক্ত মাদ্রাসার আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে আসামিরা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।

এদিকে ফেনীর পুলিশ ইনভেস্টিগেশন অব ব্যুারোর (পিবিআই) কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন ও শামীম তাদেরকে অনেক তথ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন। নুর উদ্দিন পিবিআই’র কাছে স্বীকার করে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাদেরকে (হত্যাকারীদের) নুসরাত জাহান রাফীর হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কীভাবে কী করতে হবে তা বিস্তারিত নির্দেশনা দেন।

পিবিআই-এর কর্মকর্তা বলেন, ‘নুর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম তাদের কাছে আরও কিছু তথ্য দিয়ে আরও নাম দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এখন তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এসব তথ্য যাচাইবাছাই করে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হবে।

এই মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম তদন্তকারী কমকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মাদরাসা কমিটির সহ সভাপতি রুহুল আমিনের নির্দেশে আসামিরা তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এজন্য সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার এবং মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন।

সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া শাহাদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরো জানান, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর সে দৌড়ে নীচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানায়। রুহুল আমিন বলে, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।

শাহদাত হোসেন শামীম বলেছে, নুসরাতের দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিল। নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, দেড় মাস আগেও সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সে তা প্রত্যাখান করার পাশাপাশি অপমানও করেছে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

আরেক আসামি নুর উদ্দিন জানিয়েছে, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণিও ছিল। নুর উদ্দিন জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নানা সময়ে ছাত্রীদের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানি করতো।

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে অধ্যক্ষ সব সময় যৌন হয়রানি করত। এ ঘটনায় নুসরাত থানায় অভিযোগ করলে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা তুলে না নেওয়ায় নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষার আগ মুহূর্তে মিথ্যা কথা বলে নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় জীবনের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান তিনি। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

You might also like

advertisement