মকছুদ ও শিক্ষক টাকা দেয় খুনিদের

advertisement

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে থানা পুলিশকে হাত করা এমনকি গ্রেফতার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন দাঁড় করানো- এসব কিছুই ছিল হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায়।

গত ৪ এপ্রিল শাহাদাত ও নূর উদ্দিনসহ কয়েকজন কারাগারে থাকা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন। সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মকছুদ আলম, আওয়ামী লীগ নেতা ও মাদ্রাসা কমিটির সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আলিম ও ফাজিল শিক্ষার্থীসহ ১৩/১৪ জন হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেয়।

মকছুদ ও এক শিক্ষক এ জন্য খুনিদের দুই দফায় ১৫ হাজার টাকা দেয়। হত্যাকাণ্ডে কে কি ভূমিকা রাখবে, কার কতটুকু দায়িত্ব থাকবে তাও আগে থেকে ঠিক করা ছিল। সে অনুযায়ী নুসরাতকে মাদ্রাসায় ঢোকার পর ডেকে ছাদে নিয়ে যায় অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি। আগে থেকে সেখানে ছিল কামরুন নাহার মণি। ছাদে গেলে নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় শাহাদাত। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর রুহুল আমিনকে বিষয়টি জানানো হয়। থানা পুলিশ ম্যানেজ ও আন্দোলন দাঁড় করানোও ছিল তার দায়িত্বে।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

নূর ও শামীমকে আদালতে হাজির করা হয় গত রবিবার বেলা ৩টায়। এরপর তাদের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেন বিচারক, তা চলে রাত ১টা পর্যন্ত। আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জবানবন্দি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। থানা পুলিশ, আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ফেনীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নূর উদ্দিন ও শাহাদাত অনেক তথ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে।

নূর উদ্দিন পিবিআইর কাছে স্বীকার করে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাদের (হত্যাকারীদের) নির্দেশ দিয়েছিল, নুসরাত জাহান রাফির হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কি ভাবে কি করতে হবে তার বিস্তারিত জানায় সে ।

পিবিআই-এর কর্মকর্তা বলেন, নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম তাদের কাছে আরো কিছু তথ্য দিয়ে আরো নাম দিয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখন তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হবে।

তদন্ত সূত্র জানায়, নূর উদ্দিন ও শাহাদাত তদন্তকারী কমকর্তাদের কাছে স্বীকার করে, যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর রুহুল আমিনের নির্দেশে আসামিরা এই অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এজন্য সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকা দিয়েছিল এবং এক শিক্ষক আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে।

শাহাদাত জবানবন্দিতে আরো জানায়, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর সে দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানায়। রুহুল আমিন বলে, ‘আমি জানি। তোমরা চলে যাও।’

শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছে, ‘নুসরাতের দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিল।’ নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শাহাদাত বলে, দেড় মাস আগে সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি অপমানও করেছে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

আরেক আসামি নূর উদ্দিন জানিয়েছে, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণিও ছিল।

সে জানায়, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নানা সময়ে ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করত।

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মকছুদ আলমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। সোনাগাজী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোহরাব হোসেন এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ ঘটনায় মোট ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানান আদালত পরিদর্শক মো. জিলানি।

এদিকে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কয়েকদিন আগেই তাকে আটক করা হলেও গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি গতকাল নিশ্চিত করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। পিবিআই জানায়, শম্পা রিমান্ডের আদেশপ্রাপ্ত। নুসরাত হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি তার সহপাঠী মো. শামীমকে (১৯) গ্রেফতার করেছে পিবিআই সদস্যরা। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাকে সোনাগাজীর চরচান্দিয়া গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়।

আদালতে আসামি মকসুদ আলমকে আনার পর ফেনীর আইনজীবীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। আইনজীবীরা আরো বলেন, তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইউসুফ আলমগীর তার ওকালতনামা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

এদিকে, নুসরাতের ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে সোনাগাজীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফেনী শহীদ মিনারে সুজন মানববন্ধন করেছে।

You might also like

advertisement