অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না

advertisement

যথেচ্ছ ব্যবহারে মানুষের শরীরে কাজ করছে না অ্যান্টি-বায়োটিক। আইসিইউতে ৮০ ভাগ রোগীর মৃত্যুর কারণ অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে কাজ না করা। শুধু আইসিইউ, সিসিইউর রোগীরাই নয়, শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষের শরীরেই এখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে জীবাণু। স্বাস্থ্য ঝুঁকির এই বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যতদিন না ওষুধ বিক্রি বন্ধ হবে, ততদিন অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ঠেকানো যাবে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন। অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার অব্যাহত থাকলে বয়ে আনতে পারে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক একের পর এক অকার্যকর হচ্ছে। এটা জাতীয় উদ্বেগের কারণ। মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রামের ডাক্তাররা অহরহ দিয়ে দিচ্ছে। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন অ্যান্টিবায়োটিকের নতুন আবিষ্কার তেমন হচ্ছে না। কারণ তাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন প্রয়োজন হচ্ছে না। উন্নত দেশগুলো এখন যৌন, চুল ওঠা, হূদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরিতে বেশি ব্যস্ত থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বড় চ্যালেঞ্জ। ওষুধ নীতিতে বলা আছে, রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। তিনি বলেন, হাইকোর্ট রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শিগগিরই এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে।

২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে মোট ৯০০ রোগী ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৪০০ জন মারা যায়। এদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপারবাগের’ উপস্থিতি ছিল। এটা বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বার্তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক বছর আগে থেকেই জানাচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয় তার অর্ধেকই ব্যবহূত হয় পশু উত্পাদনে। তাই যেসব খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, যেসব ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মানুষের শরীরকে আক্রমণ করে, তারা দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের সংস্পর্শে থাকার কারণে ওইসব ওষুধ থেকে বেঁচে যাওয়ার কিছু ক্ষমতা অর্জন করে। এটাকেই চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স’।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল) গাভীর খাবার, দুধ, দই ও প্যাকেট-জাত দুধ নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছে। গবেষণায় যে ফলাফল উঠে আসে সেখানে গাভীর দুধে (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। একই সঙ্গে প্যাকেটজাত গাভীর দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। এনএফএসএলের এই গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লুত্ফুল কবির। তিনি বলেন, যেসব উপাদান পাওয়া গেছে, এর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদানই বেশি টেট্টাসাইক্লিন, এনরোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোসিন ও আফলাটক্সিন অ্যান্টিবায়োটিক। এগুলো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়ার অর্থ হলো এগুলো যেকোনো বয়সী মানুষের শরীরে ঢুকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, যেসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নির্দিষ্ট সময়মাফিক অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া বা প্রয়োগ না করা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ইচ্ছামাফিক খাওয়া (২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি তিনজন রোগীর একজন চিকিত্সকের কোনো পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকেন) এবং বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করার ফলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লুত্ফুল কবির বলেন, আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাচ্ছি তার অনেকগুলো থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন- মুরগির মাংস, গরু, ছাগল বা খাসির মাংস, দুধ এবং দুগ্ধ জাতীয় খাবার, মাছেও হরমোন ব্যবহার করা হয়, সেখানেও এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয় রোগ প্রতিরোধী করার জন্য, শাক-সবজি যদিও এতে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না, তবে কীটনাশক দেওয়া হয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এখনকার অধিকাংশ পশুখাদ্যে, গো-খাদ্যে, পোল্ট্রি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। আর এইসব প্রাণীর দেহে এভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকা অবস্থায় সেসব প্রাণীর মাংস আবার মানুষ খাচ্ছে। এসব খাদ্যে উচ্চমাত্রার মার্কারি এবং ক্রোমিয়ামও থাকে। এভাবে তা মানবদেহে চলে যাচ্ছে।

You might also like

advertisement