বিউটি পার্লারে সৌন্দর্য বৃদ্ধির বদলে সৌন্দর্যহানি

advertisement

নারী সাজতে ভালোবাসেন। বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ীরাই বা বসে থাকবেন কেন? পরিপাটি করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নারীকে উপস্থাপন করতে তারাও লেগে গেলেন ব্যবসায়। নানা জায়গায় খোলা হলো বিউটি পার্লার।

নানা অনুষ্ঠান, উপলক্ষকে সামনে রেখে নারীও ছুটতে লাগল সেখানে। আগে বাসার বাইরে গিয়ে সাজার বা রূপচর্চার রেওয়াজ তেমন ছিল না। কেবল বিত্তবান রূপসচেতন নারীই পার্লারে যেতেন; কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীও যাচ্ছেন বিউটি পার্লারে। আগে বিয়ের কনেকে বাসায় সাজাতে দেখা যেত, এখন কনেকে সাজাতে নামি-দামি পার্লারে গিয়ে অর্ধ লক্ষ টাকা পর্যন্তও ব্যয় করছেন কেউ কেউ। ১৯৮০র দশকের শেষদিকে বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি বিউটি পার্লার ছিল। ৯০র দশকে পার্লারের প্রসার ঘটতে শুরু করে। আগে রাজধানী ঢাকা এবং বড় বড় জেলা শহরগুলোতেই মূলত বিউটি পার্লারের চল ছিল; কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। ঢাকা ও জেলা শহর ছাড়িয়ে বিউটি পার্লার এখন উপজেলা সদর, এমনকি গ্রামের প্রত্যন্ত বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিউটি পার্লারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ কর্মীর সংখ্যা সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পার্লারে গিয়ে নারীকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, অদক্ষ কর্মীর পাল্লায় পড়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির বদলে সৌন্দর্যহানি ঘটছে।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি পার্লারে ফেসিয়াল করাতে যান আঁখি। তাকে এলোভেরা ফেসিয়াল করিয়ে দেবেন বলে ৮০০ টাকা চার্জ আদায় করে এক কর্মী তাকে ফেসিয়াল রুমে নিয়ে যায়। ফেসিয়াল শেষে আঁখির মুখের ত্বক কিছুটা জ্বালাপোড়া করতে থাকে। পার্লারের মেয়েরা বলে, একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু পরদিন দেখা যায় তার পুরো মুখের ওপরের ত্বক পুড়ে গেছে। আঁখি বলেন, এ অবস্থায় তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক জানান, ক্ষারযুক্ত ক্রিম দিয়ে ত্বক খুব বেশি রগরানোর ফলে ত্বকের ওপরের স্তর পুড়ে গেছে। মিতু নামে আরেকজন অভিযোগ করে বলেন, “আমি মেনিকিউর পেডিকিউর করাতে গেলে পার্লারের আনাড়ি মেয়েরা আমার হাতের আঙুলের চারপাশ কেটে ফেলে, এরপর চার/পাঁচ দিন আঙুলের ব্যথায় কোনো কাজ করতে পারছিলাম না।” আর বিয়ের কনেকে সাজাতে গেলে সাদা ভারি স্তরের মেক-আপ দিয়ে চেহারা ঢেকে দেওয়ার অভিযোগ তো অহরহ শোনা যায়।

এ বিষয়ে বিন্দিয়া বিউটি পার্লারের কর্ণধার শারমিন কচি বলেন, পার্লারের ব্যাপক প্রসারের ভালো ও খারাপ দুটো দিকই আছে। ভালো দিক হচ্ছে নারীরা সহজে বাড়ির পাশেই সেবা পাচ্ছেন। নারীদের পার্লারগুলোতে কর্মসংস্থান হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ পার্লারের সেবার মান ভালো নয়। খুব সামান্য শিখেই অনেকে পার্লার খুলে বসছেন, তাতে করে তাদের সেবার মানের ব্যাপারে অনেক অভিযোগ উঠছে। সেবার মান ভালো না হওয়াতে দ্রুতই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে অনেক পার্লার।

সরেজমিনে বিউটি পার্লারে গিয়ে দেখা যায়, কেউ হাত-পা পরিষ্কার করছেন (মেনিকিউর-পেডিকিউর), কেউবা চুল কাটিয়ে নিচ্ছেন নিজের মুখের অবয়বের সঙ্গে মিলিয়ে, কেউ আবার মাথার চুল রং করে নিচ্ছেন। এছাড়া অনেকে চুলে তেল ম্যাসাজ করে নিচ্ছেন, কেউ বা আবার পার্টিতে যাওয়ার জন্য পার্লারের এক্সপার্টদের দিয়ে শাড়ি পরিয়ে নিচ্ছেন। বাচ্চা মেয়েদের কান ফুটো করা, বড়দের নাক ফুটো করার কাজটিও এখন পার্লারগুলোই করছে।

কথা হয় পার্লারে সেবা নিতে আসা লালমাটিয়ার বাসিন্দা রুমানা বশিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, চাকরি করে বাচ্চা-সংসার সামলিয়ে নিজের রূপচর্চার সময় হয় না। তাই মাসে একবার বন্ধের দিনে আসি পার্লারে। হাত-পা, মুখ, চুল, সব পরিষ্কার করে বাসায় ফিরি। পার্লারের জন্যও মাসে একটা বাজেট রাখি।

ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের শিক্ষক কানিজ ফাতেমা বলেন, আগে নিজে নিজেই বাসায় রূপচর্চা করতাম; কিন্তু এখন সময় পাই না। চাকরি করি, বাসায় ফিরে সংসারের কাজ, সব সামলিয়ে নিজের জন্য সময় হয় না। ফলে পার্লারই আমার একমাত্র ভরসার জায়গা।

‘রূপসা’ বিউটি পার্লারের কর্ণধার রূপা শিকদার বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই প্রথমে নিজের রূপর্চচার প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলাম। সেই আগ্রহ থেকে বিউটি পার্লারের কাজ শিখি। এখন নিজেই এই পার্লার থেকে আয় করছি। বেশ ভালোই লাগে। আমার কাষ্টমার ২/৩ বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরের নারী। তিনি বলেন, এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মেয়েরা স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, ফলে তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। কমবেশি রোজগারও করছে নারীরা। তখন নিজের মোটা বেখাপ্পা ভ্রূ-টা পার্লারে এসে শেপিং করে নিচ্ছে। এভাবেই মফস্বল শহর ও গ্রামে-গঞ্জেও চালু হয়েছে বিউটি পার্লারের প্রচলন।

You might also like

advertisement